নিজস্ব প্রতিবেদক,
ঢাকা:দেশের কর বিভাগে আয়কর ফাঁকি ও অবৈধ অর্থ বৈধ করার নানা কৌশলের কথা শোনা গেলেও এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অভিনব জালিয়াতির তথ্য উঠে এসেছে। রাজধানী ঢাকার বারীধারা ডিজাইন এইস লিমিটেডের চেয়ারম্যান বিপুল কান্তি দাসের বিরুদ্ধে নিজের গৃহিণী স্ত্রীর নাম ব্যবহার করে প্রায় ১০ কোটি টাকার কালো টাকা সাদা করার এক অবিশ্বাস্য ও চাঞ্চল্যকর তথ্য-প্রমাণ মিলেছে। ‘
ডেইলি ভয়েস নিউজ’-এর এক অনুসন্ধানে এই জালিয়াতির চিত্র সামনে এসেছে।জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) কর অঞ্চল-১৪ (ঢাকা)-এর কর কমিশনারের নিকট একজন সচেতন নাগরিকের দায়ের করা লিখিত অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট আয়কর নথি পর্যালোচনা করে এই অর্থ পাচার ও কর ফাঁকির প্রমাণ পাওয়া যায়।গৃহিণীর নামে কাল্পনিক ব্যবসা ও কোটি কোটি টাকার পুঁজিনথি অনুযায়ী, এই জালিয়াতির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিপুল কান্তি দাসের স্ত্রী পূর্ণিমা দাস।
তিনি পেশায় একজন পুরোদস্তুর গৃহিণী, যার নিজস্ব কোনো বৈধ আয়ের উৎস নেই। এমনকি তার বাবা সত্য রায় এবং মা মিনতি রায়ও আর্থিকভাবে সচ্ছল নন এবং তাদের কোনো আয়কর ফাইল বা কর প্রদানের ইতিহাস নেই।
অথচ এই গৃহিণীর নামেই রাতারাতি কোটি কোটি টাকার ব্যবসা ও নগদ সম্পদ প্রদর্শন করা হয়েছে, যা মূলত বিপুল কান্তি দাসের অবৈধ কালো টাকা বৈধ করার একটি সুনিপুণ অপচেষ্টা।একদিনেই ৯ বছরের ফাইল অনুমোদন: কর প্রশাসনের নজিরবিহীন অনিয়মঅনুসন্ধানে দেখা যায়, এই কর ফাঁকির মূল কারসাজি শুরু হয় ২০২১ সালে।
বিপুল কান্তি দাস তার অবৈধভাবে অর্জিত কালো টাকাকে দীর্ঘদিনের বৈধ ব্যবসা থেকে অর্জিত সম্পদ হিসেবে দেখানোর জন্য একটি নজিরবিহীন আইনি ফাঁকফোকরের আশ্রয় নেন।১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১: কর অঞ্চল-১৪ এর অধীনে কর সার্কেল-৩০৫ এ পূর্ণিমা দাসের নামে একটি ই-টিন (e-TIN: 7726690928) সার্টিফিকেট নেওয়া হয়।৩ জুন, ২০২১: কর সার্কেল-৩০৫ এর তৎকালীন সহকারী কর কমিশনার মো. জাহিদুলের ইসলাম অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে পূর্ণিমা দাসের ২০১০-১১ করবর্ষ থেকে শুরু করে ২০১৮-১৯ করবর্ষ পর্যন্ত টানা ৯ বছরের আয়কর নির্ধারণী আদেশ একই দিনে স্বাক্ষর ও অনুমোদন করেন।
একদিনে ৯ বছরের ব্যাক-ডেটেড ফাইল অনুমোদনের এই ঘটনাটি কর প্রশাসনের ইতিহাসে একটি বড় অনিয়ম ও অসঙ্গতি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।কোনো অস্তিত্ব নেই ব্যবসার, ব্যালেন্স শিটে ১০ কোটি টাকাপূর্ণিমা দাসের ২০১০-১১ করবর্ষের রিটার্ন ফাইল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেখানে ব্যবসার ধরন হিসেবে ‘ডিলিংস ইন বিবিধ গুডস’ (বিবিধ পণ্যের ব্যবসা) উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ এই ব্যবসার কোনো বৈধ ট্রেড লাইসেন্স, দোকান বা গুদামের অস্তিত্ব নথিতে নেই।
এই কাল্পনিক ব্যবসা থেকে প্রথম বছরে মাত্র ২,৪০,০০০ টাকা মোট প্রাপ্তি এবং ১,৬০,০০০ টাকা নিট লাভ দেখিয়ে মাত্র ২,০০০ টাকা কর দেওয়া হয়।কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এই সামান্য আয়ের বিপরীতে ওই বছরের ব্যালেন্স শিটে পূর্ববর্তী বছরের পুঁজি হিসেবে এক লাফে ৩,৭৭,২১,০০০ টাকা (তিন কোটি ৭৭ লাখ ২১ হাজার টাকা) নগদ সম্পদ দেখানো হয়েছে।
প্রথম বছরেই তিনি কোথা থেকে এই পৌনে চার কোটি টাকার বিশাল পুঁজি পেলেন, তার কোনো ব্যাখ্যা বা আয়ের উৎস আয়কর নথিতে দেওয়া হয়নি।একইভাবে ওই বছরের ৩০শে জুন পর্যন্ত পূর্ণিমা দাসের মোট নিট সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১০,১০,৯৬,০০০ টাকা (দশ কোটি দশ লাখ ছিয়ানব্বই হাজার টাকা)। অর্থাৎ, কর প্রদানের প্রথম বছরেই একজন গৃহিণীকে কাগজে-কলমে ১০ কোটি টাকার মালিক বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী করবর্ষগুলোতেও (২০১১-১২ থেকে ২০১৮-১৯) একইভাবে নামমাত্র লাভ এবং ২,০০০ থেকে ৩,০০০ টাকা কর দিয়ে এই বিশাল সম্পদকে ফাইলে টিকিয়ে রাখা হয়।২০২০-২১ বর্ষে সাড়ে ৫ কোটি টাকা অলস নগদ অর্থঅনিয়মের এই ধারাবাহিকতা এখানেই শেষ নয়। ২০২০-২১ করবর্ষের আয়কর রিটার্ন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, পূর্ণিমা দাসের ব্যবসায়িক পুঁজি হিসেবে ৩,৭৭,৯৬,০০০ টাকা এবং হাতে নগদ হিসেবে বিপুল অঙ্কের ৫,৬০,০০,০০০ টাকা (পাঁচ কোটি ষাট লাখ টাকা) দেখানো হয়েছে।
ফলে তার মোট প্রদর্শিত সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯,৪০,০০,০০০ টাকা। কোনো সক্রিয় ব্যবসা বা আয়ের উৎস ছাড়া বছরের পর বছর সাড়ে ৫ কোটি টাকা নগদ ঘরে বা ব্যাংকে অলস ফেলে রাখা এবং কোটি কোটি টাকার ব্যবসায়িক পুঁজি অপরিবর্তিত থাকা সাধারণ মানুষের মনে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।ধানমন্ডি ও বনানীতে আরও ১৯ কোটি টাকার বিলাসবহুল ফ্ল্যাটস্ত্রীর নামে ১০ কোটি টাকা সাদা করার পাশাপাশি বিপুল কান্তি দাস ও তার স্ত্রীর নামে আরও অঢেল সম্পত্তির খোঁজ মিলেছে:ধানমন্ডি: রোড নম্বর ১২/এ, বাসা নম্বর ৬৯, ফ্ল্যাট নম্বর বি-২/৩ ঠিকানায় রয়েছে প্রায় ৭ কোটি টাকার বিলাসবহুল ফ্ল্যাট।বনানী: ব্লক-জি, রোড নম্বর ২৩, বাসা নম্বর ৯৬, ‘গফুর রিজ গার্ডেন’-এর ৭/এ নম্বর ফ্ল্যাটে রয়েছে প্রায় ১২ কোটি টাকার আলিশান ফ্ল্যাট।ব্যাংক হিসাব: বিপুল কান্তি দাসের বেশ কয়েকটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অর্থ রয়েছে।
অভিযুক্তের দায় এড়ানোর চেষ্টাএই জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের বিষয়ে অভিযুক্ত বিপুল কান্তি দাসের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দায় এড়িয়ে বলেন, "আমি এই বিষয়ে কিছুই জানি না। আমার উকিল আপনার উত্তর দিতে পারবেন।