ইসলামিক ফাউন্ডেশনে কুরআন কিনতেও মহালুটপাট!

আপলোড সময় : ২৫-০৮-২০২৬ ০৪:৪৭:২৮ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৫-০৮-২০২৬ ০৪:৪৭:২৮ অপরাহ্ন



ইসলামিক ফাউন্ডেশনে জালিয়াতি-দুর্নীতির খবর নতুন নয়। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এই প্রতিষ্ঠানে পবিত্র কোরআনুল কারীম মুদ্রণ ও কেনাকাটাতেও হয়েছে অনিয়ম-জালিয়াতি। কুরআন না ছাপিয়েও হাতিয়ে নেয়া হয়েছে টাকা। শুধু তাই নয়, প্রকৃত দরের চেয়ে কম মূল্যে কুরআন ও পুস্তক কিনে হিসাবের খাতায় বেশি দাম দেখায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের হর্তা-কর্তারা। আশ্চর্য্যের বিষয় হলো, কার্যাদেশ ছাড়াই কেনা হয়েছে সহজ কুরআন শিক্ষাসহ প্রাক-প্রাথমিকের বই।

পবিত্র কুরআনের কপি ছাপানো নিয়ে জালিয়াতি; অবিশ্বাস্য এমন কাণ্ড ঘটেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে।

মসজিদভিত্তিক প্রকল্পে পবিত্র কুরআনুল কারীম ও ধর্মীয় বই সরবরাহে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রেসকে কার্যাদেশ দেয়া হয়। যা ফাউন্ডেশনের নিজস্ব প্রেসে ছাপানো ও বাঁধাইয়ের বিধান রয়েছে। এ কাজে বেসরকারি প্রেসকে সাব-কন্ট্রাক্ট দেয়ার কোনো সুযোগ নেই।

কিন্তু,  হাতে আসা অডিট রিপোর্ট বলছে, ২০১৩-২০১৪ থেকে ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে পবিত্র কুরআনের মোট ২৩ লাখ ৩১ হাজার কপি কেনা হয়, বাইরের প্রেস থেকে। ফাউন্ডেশনের প্রেসের জন্য প্রতি কপির মূল্য ধরা হয়েছিল ১৯৫ টাকা। কিন্তু, বাইরে থেকে ওই দরের চেয়ে অনেক কমে কিনে পাঁচ বছরে লোপাট করা হয়, ১২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। আর ১ লাখ কুরআন সরবরাহ না করেই লোপাট করা হয় প্রায় ২ কোটি টাকা।

কম দামে নিম্নমানের কাগজে পবিত্র কুরআনের কপি সরবরাহ করায় সে সময় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মানযাচাইকারী কর্মকর্তা আব্দুর রশীদ আল মামুন ক্ষোভও প্রকাশ করেছিলেন।

আব্দুর রশীদ আল মামুন  বলেন, ‘আমি বলেছিলাম, আল্লাহর দোহাই, নিম্নমানের দিয়েন না, যখনই মান খারাপ পেয়েছি তখনই রিপোর্ট দিয়েছি।’

কুরআনের এই কপিগুলো সরবরাহ করেছে ধলেশ্বরী ও দশদিশা প্রিন্টার্সসহ কয়েকটি ছাপাখানা। নিম্নমানের কপি কেন সরবরাহ করা হয়েছে; তা জানতে দশদিশা ছাপাখানায় যায় স্টার নিউজ।

দশদিশা গ্রুপের চেয়ারম্যান আমীন হেলালী বলেন, ‘তাদের (ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রেস) চাহিদার কথা তারা আমাকে জানিয়েছেন। যেভাবে দিতে বলা হয়েছে, আমি ঠিক সেভাবেই টেন্ডার করেছি।’

অনিয়মের এখানেই শেষ নয়। নথি বলছে, ২০১৫ থেকে ২০১৯ শিক্ষাবর্ষের জন্য সহজ কুরআন শিক্ষাসহ ৩টি বইয়ের প্রায় দেড় কোটি কপি ছাপানো হয় বাইরের প্রেস থেকে। অর্ধেক মূল্যে এ সব বই কিনে লোপাট হয়, প্রায় ২১ কোটি টাকা।

প্রিয়াঙ্কা প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবিলকেশনের স্বত্বাধিকারী সামছুল হক বলেন, ‘২০১০ থেকে ২০১১ সাল থেকেই বাইরের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করানো হচ্ছে। তাদের কী নীতিমালা, সেটা তো আমরা জানি না। আমাদের কাছে প্রিন্ট করতে দেয়া হয়েছে, আমরা সেটাই করেছি। এটা করার নিয়ম নেই, আমরা কীভাবে বুঝব?’

২০২৬ শিক্ষাবর্ষেও সহজ কুরআন শিক্ষাসহ নিম্নমানের পাঠ্যপুস্তক বিতরণ ও অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠন করে ধর্ম মন্ত্রণালয়। তবে, কমিটির রিপোর্ট আজও আলোর মুখ দেখেনি।

এদিকে এসব অনিয়মের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রেস শাখার ব্যবস্থাপক মো. মহিউদ্দীন মাহিন। তিনি বলেন, ‘এগুলো কর্তৃপক্ষকে বলেন, আমি তো আগেই বলেছি, আমি এই লাইনে অভিজ্ঞ নই।’ মো. মহিউদ্দীনের নিয়োগ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে এড়িয়ে যান তিনি।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অডিট বিভাগের তথ্য বলছে, বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠানটিতে মুদ্রণ-বাঁধাই, কেনাকাটা, জালিয়াতির নিয়োগসহ নানান খাতে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত নয়-ছয় হয়েছে, ২ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা।

বিষয়টিকে ‘অপ্রত্যাশিত’ ও ‘কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে মন্তব্য করে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সচিব শেখ মুর্শিদুল ইসলাম বলেন, ‘এটি নিয়ে কোনো ধরনের দুর্নীতি সহ্য করা হবে না। যে-ই জড়িত থাকুক, তাকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সদ্য বিদায়ী মহাপরিচালক বলেন, ‘চোরও তো কুরআন শরীফ চুরি করে না। তদন্তে প্রমাণ পাওয়ার পরই কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করেছে। এখন প্রতিবেদনটি আবারও খতিয়ে দেখে অধিকতর তদন্ত করা হবে। এর আগে তদন্ত কমিটিকে অসহযোগিতা করায় প্রেসের সাবেক ব্যবস্থাপক আব্দুল্লাহ আল মামুনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।’

বিষয়টি নিয়ে বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ। এমন ঘটনায় তিনি রীতিমতো হতভম্ব। তিনি বলেন, ‘ধর্মীয় কাজে কোনো অর্থের ঘাটতি থাকলে অনেক সময় মানুষ নিজের পকেটের টাকা খরচ করে তা পূরণ করে দেন, কিংবা অন্যের কাছ থেকে সহযোগিতা নেন। অথচ সেখান থেকেই যদি ঘুষ ও দুর্নীতির মতো জালিয়াতির ঘটনা ঘটে, তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।’

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অডিট বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মুদ্রণ-বাঁধাই, কেনাকাটা ও নিয়োগসহ বিভিন্ন খাতে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৫৩১ কোটি টাকার অনিয়মের বিষয়ে অডিট আপত্তি উঠেছে। যা এখনো অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে।

গেল বছর ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন বলছে, বছরের পর বছর ধরে অনিয়ম আর দুর্নীতির বেড়াজালে আবদ্ধ ইসলামিক ফাউন্ডেশন। তবে এসব বন্ধে কোনো সরকারের আমলেই নেয়া হয়নি কার্যকর ব্যবস্থা।

সম্পাদকীয় :

উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য : ডাঃ মোঃ হাফিজুর রহমান
সম্পাদক : তোফাজল আহমেদ ফারুকী
ব্যাবস্থাপনা সম্পাধক : আব্দুল্লাহ রানা সোহেল
প্রকাশক : মোঃ সোহেল রানা
বার্তা সম্পাদক : মোঃ আব্দুল কাদের জিলানী
প্রধান প্রতিবেদক : হাসিবুর রহমান হাসিব 

যোগাযোগের ঠিকানা :

লাবিনা এপার্টমেন্টে # বাড়ি এ-৩, রোড # ০৮, সেক্টর #০৩,উত্তরা
উত্তরা মডেল টাউন -ঢাকা -১২৩০, বাংলাদেশ

মোবাইল :  ০১৭১৭-৬৭৬৬৬৪

ই-মেইল :  dailyvoicenews247@gmail.com