সরকারি খাদ্যগুদামের হিসাব আর বাস্তব মজুতের মধ্যে এত বড় ফারাক কীভাবে তৈরি হলো? মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলা খাদ্যগুদামের সাম্প্রতিক বিশেষ অডিট এই প্রশ্নই সামনে এনেছে।
খাদ্য অধিদপ্তরের বিশেষ অডিটে গুদামের কাগজপত্র ও প্রকৃত মজুত যাচাই করতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্যের ঘাটতি ধরা পড়ে। কয়েকটি প্রতিবেদনে ১১০ টন চাল ও ২০ টন গম, অর্থাৎ মোট ১৩০ টন খাদ্যশস্যের হিসাব না মেলার কথা বলা হয়েছে। আবার প্রথম আলো ও যুগান্তরের প্রতিবেদনে চালের ঘাটতি ১০০ টন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ অডিটের প্রাথমিক তথ্য নিয়েও প্রতিবেদনে কিছু পার্থক্য রয়েছে।
তবে শুধু চাল-গমের ঘাটতিই নয়, অডিটে আরও চমকপ্রদ কিছু অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। খাদ্য অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপনের তথ্য উদ্ধৃত করে দ্য ডেইলি স্টার ও যুগান্তর জানিয়েছে, গুদামে সরকারি হিসাবের তুলনায় ৪১ টন ধান বেশি পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে প্রায় ৬ হাজার ৫০০টি বস্তারও ঘাটতি ধরা পড়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, নিয়মিত হিসাব ও পাক্ষিক প্রতিবেদনে যদি বড় কোনো সমস্যা ধরা না পড়ে, তাহলে সরেজমিন অডিটে এত বড় গরমিল কীভাবে বেরিয়ে এলো?
গত ২৬ আগস্ট খাদ্য অধিদপ্তরের ঢাকার একটি বিশেষ অডিট দল ঘিওর খাদ্যগুদামে গিয়ে হিসাবের খাতাপত্রের সঙ্গে বাস্তব মজুত মিলিয়ে দেখে। গরমিল ধরা পড়ার পর গুদামটি সাময়িকভাবে সিলগালা করা হয় এবং বিস্তারিত তদন্ত শুরু হয়।
এরপর ২৭ আগস্ট খাদ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক (সংস্থাপন) অনির্বাণ ভদ্রের সই করা পৃথক প্রজ্ঞাপনে ঘিওর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফারহানা আক্তার এবং খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিপুল কুমারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আইয়ুব রায়হানের ভাষ্য, অডিটে বড় ধরনের গরমিল পাওয়ার পর তদন্তের স্বার্থেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের তত্ত্বাবধানে দেশের খাদ্যগুদামগুলোতে বিশেষ অডিট চলছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে বিপুল কুমার জানিয়েছেন, বিষয়টি তদন্তাধীন থাকায় তিনি মন্তব্য করতে চান না। ফারহানা আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই খাদ্যশস্যের ঘাটতি আসলে কীভাবে হলো?
হিসাবের ভুল, সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো অনিয়ম রয়েছে, তা তদন্তেই পরিষ্কার হওয়ার কথা। কারণ সরকারি খাদ্যগুদামের চাল-গম শুধু কোনো প্রতিষ্ঠানের সম্পদ নয়, এগুলো রাষ্ট্রের খাদ্যনিরাপত্তা ও জনগণের অর্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
তাই শুধু দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করাই শেষ কথা নয়। অডিটের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ, ঘাটতির প্রকৃত কারণ শনাক্ত এবং কারও দায়িত্ব বা অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।
ঘিওরের গুদামের এই ঘটনা হয়তো একটি স্থানীয় অডিটের ফল, কিন্তু প্রশ্নটি জাতীয়: সরকারি গুদামের খাতায় যা আছে, বাস্তবে কি তা সত্যিই আছে