রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রায় ৭ কোটি টাকা মূল্যের ১৮ শতক জমি মাত্র ৫০ লাখ টাকা ঘুসের বিনিময়ে হাতছাড়া করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সিটি করপোরেশনের একটি চক্রের যোগসাজশে জমি-সংক্রান্ত মামলায় ইচ্ছাকৃতভাবে আদালতে অনুপস্থিত থেকে একতরফা রায়ের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। তবে মামলাটি খারিজ হওয়ার আট মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত আপিল করেনি সিটি করপোরেশন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নগরীর কেরানীপাড়া চৌরাস্তা মোড়ে সিটি করপোরেশনের একটি কাঁচাবাজার রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ওই বাজারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন রমজান আলী মধু। সেখানে নির্মিত দোকানঘরগুলো ভাড়া দিয়ে তিনি প্রতি মাসে প্রায় এক লাখ টাকা আদায় করেন বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
সিটি করপোরেশনের নথিপত্র অনুযায়ী, রঘুনাথগঞ্জ মৌজার কেরানীপাড়া চৌরাস্তা মোড়ে সিএস ৪৭৩ ও ৫৪৩ নম্বর দাগে মোট ১৮ শতক জমি সিটি করপোরেশনের নামে রেকর্ডভুক্ত। তবে রমজান আলী মধুর কাছে ওই জমির মালিকানা দাবির পক্ষে কোনো দলিল নেই। স্থানীয়ভাবে জমিটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৭ কোটি টাকা বলে জানা গেছে।
জমিটি উদ্ধারে ২০২১ সালে রংপুরের যুগ্ম জেলা জজ আদালত-১-এ মামলা করে সিটি করপোরেশন। মামলার দীর্ঘ শুনানিতে রমজান জমির মালিকানার পক্ষে কোনো দলিল আদালতে উপস্থাপন করতে পারেননি বলে জানা গেছে।
তবে অভিযোগ রয়েছে, সিটি করপোরেশনের কয়েকজন সার্ভেয়ার ও সম্পত্তি শাখার কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ করে মামলায় সুবিধা নেন রমজান। আদালত থেকে নোটিশ জারি হলেও মামলার শুনানিগুলোতে বাদী সিটি করপোরেশন ও তাদের নিয়োজিত আইনজীবী অনুপস্থিত ছিলেন। এভাবে সাত কার্যদিবস আদালতে অনুপস্থিত থাকার পর ২০২৫ সালে একতরফা রায়ে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়।
এতে দীর্ঘদিন ধরে দখলে থাকা জমির ওপর রমজানের অবস্থান আরও শক্ত হয়।
রমজান আলী মধু দাবি করেছেন, সিটি করপোরেশন আদালতে উপস্থিত না থাকায় তিনি মামলায় সুবিধা পেয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, সিটি করপোরেশন ও তাদের আইনজীবীকে ‘ম্যানেজ’ করতে তাকে ৫০ লাখ টাকা দিতে হয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন দোকান মালিকও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন।
তাদের দাবি, দোকান বরাদ্দ বা দখল দেওয়ার কথা বলে রমজান তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। পরে ওই অর্থের একটি অংশ সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দিয়েছেন বলে তারা অভিযোগ করেন।
রমজান আরও জানিয়েছেন, তার বাবা কীভাবে ওই জমির মালিকানা পেয়েছিলেন, সে বিষয়ে তার কাছে কোনো দলিল বা নথি নেই। দখলসূত্রে সেখানে দোকানঘর নির্মাণ করে তিনি ভাড়া আদায় করে আসছেন।
মামলাটি খারিজ হওয়ার পর আট মাস পেরিয়ে গেলেও সিটি করপোরেশন এখনো আপিল করেনি। এরই মধ্যে রমজান আলী মধু ওই জমিতে স্থায়ী মার্কেট নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। দুটি দাগের মধ্যে ১৩ ও ৫ শতক—মোট ১৮ শতক জমিতেই নির্মাণকাজ চলছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
কেরানীপাড়া চৌরাস্তা মোড়ের বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেন, জমিটি রংপুর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ছিল। তবে দীর্ঘদিন ধরে রমজান আলী মধু সেটি দখলে রেখেছেন।
এ বিষয়ে রংপুর সিটি করপোরেশনের সচিব ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিব হাসান বলেন, জমি উদ্ধারে মামলা করার পর কেন সিটি করপোরেশন টানা সাত কার্যদিবস আদালতে উপস্থিত হয়নি, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, জমিটি উদ্ধারে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অবৈধভাবে সিটি করপোরেশনের জমি হাতছাড়া হয়ে থাকলে এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।