গণপূর্ত অধিদপ্তরের পাঁচ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে সরকারি চাকরির বিধি লঙ্ঘন করে বেসরকারি ডেভেলপার ব্যবসায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে। রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় ভবন নির্মাণ, ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি এবং জমি-সংক্রান্ত ব্যবসায় তাঁদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তদন্তের আবেদন করা হয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান মিজান। তাঁর পাশাপাশি উপসহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার খান আনু, সহকারী প্রকৌশলী ই/এম আবুল বাসার, উপসহকারী প্রকৌশলী ই/এম আব্দুর রউফ এবং সহকারী প্রকৌশলী ই/এম গুলনাহার-এর বিরুদ্ধে ডেভেলপার ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য, বিভিন্ন নথি, ভিডিও ফুটেজ এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রচার-প্রচারণা বিশ্লেষণ করে এসব অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে বলে অভিযোগকারীর দাবি।
দুদকে আব্দুর রউফের বিরুদ্ধে অভিযোগ
গত ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দুদকের চেয়ারম্যান বরাবর দেওয়া একটি লিখিত অভিযোগে গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী আব্দুর রউফের বিরুদ্ধে ডেভেলপার ব্যবসায় কথিত সম্পৃক্ততা এবং ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় ভবন নির্মাণ এবং ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ডেভেলপার নেটওয়ার্কের কার্যক্রমে আব্দুর রউফের কথিত সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
অভিযোগে মোহাম্মদপুরের ওয়াশপুর টাওয়ারে একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ের ঠিকানাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে অফিস-২, ১৮/৪, নিচতলা, ওয়াশপুর টাওয়ার, ওয়াশপুর, মোহাম্মদপুর-বসিলা ব্রিজসংলগ্ন, ঢাকা ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
ফিউচার ড্রিম বিল্ডার্স ঘিরে প্রশ্ন
অনুসন্ধানে ফিউচার ড্রিম বিল্ডার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের বিল্ডিং ডিজাইন, কনস্ট্রাকশন, স্ট্রাকচারাল ও আর্কিটেকচারাল ডিজাইন, ইলেকট্রিক্যাল-প্লাম্বিং ডিজাইন, রাজউক প্ল্যান পাস, মাটি পরীক্ষা এবং ইন্টেরিয়র সলিউশন প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রচার করে।
প্রতিষ্ঠানটির মোহাম্মদপুরের ওয়াশপুর, মিরপুরের গৈদারটেক, উত্তরা দিয়াবাড়ি এবং সাভার-নবীনগর এলাকায় কার্যক্রম বা কার্যালয়ের তথ্য পাওয়া গেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, গণপূর্তের উপসহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমানের দুই ভাই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ পদে যুক্ত। তাঁদের একজন হেড অব মার্কেটিং হিসেবে কাজ করছেন বলে প্রতিষ্ঠানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়।
অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি চাকরিতে থাকা মিজানুর রহমান সরাসরি ব্যবসায় যুক্ত না থেকে পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে ডেভেলপার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততা কতটুকু, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
আবুল বাসারকে ঘিরেও ‘অদৃশ্য পার্টনারশিপের’ অভিযোগ
ডালাস ডেভেলপারস অ্যান্ড প্রপার্টিজ লিমিটেডের সঙ্গেও গণপূর্তের সহকারী প্রকৌশলী ই/এম আবুল বাসারের কথিত পার্টনারশিপের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, তাঁর সহোদর ভাই ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ-উল আলমের মাধ্যমে ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
এ ছাড়া আবুল বাসারের সহধর্মিণী গণপূর্তের সহকারী প্রকৌশলী ই/এম গুলনাহার। তাঁর বিরুদ্ধেও কথিত ডেভেলপার ব্যবসার কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
আব্দুর রউফের বিরুদ্ধে ফ্ল্যাট বিক্রির কথোপকথনের অভিযোগ
দুদকে দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, উপসহকারী প্রকৌশলী আব্দুর রউফকে মোবাইল ফোনে কোনো ভবনের কোন তলার কোন ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি করা হবে—এমন বিষয়ে কথা বলতে শোনা গেছে বলে অভিযোগকারীর দাবি।
তবে এসব কথোপকথনের প্রেক্ষাপট, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর প্রকৃত সম্পর্ক এবং আর্থিক লেনদেন ছিল কি না—তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
আনোয়ার খান আনুকে ঘিরে আরও অভিযোগ
গণপূর্তের উপসহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার খান আনু দীর্ঘদিন ধরে সাভার গণপূর্ত বিভাগে কর্মরত রয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁর বিরুদ্ধে ঢাকা-আশুলিয়া ও আব্দুল্লাহপুর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এলাকার ভ্যালুয়েশন কার্যক্রমে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। পাশাপাশি সাভার গণপূর্তের পর্যটন এলাকার আশপাশের জমিতে দোকান ভাড়া বা পজিশন বিক্রির ক্ষেত্রেও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
সরকারি চাকরির বিধিতে ব্যবসা নিয়ে কী বলা আছে?
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী, সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া সরকারি কর্মচারীর লাভজনক ব্যবসা বা বাণিজ্যে সরাসরি যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে।
গণপূর্তের প্রকৌশলীরা সরকারি নির্মাণকাজের প্রাক্কলন, তদারকি ও বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। একই সময়ে কোনো প্রকৌশলী ব্যক্তিগতভাবে নির্মাণ বা ডেভেলপার ব্যবসায় জড়িত থাকলে সেখানে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্নও উঠতে পারে।
দুদকের কাছে যেসব তদন্তের দাবি
আব্দুর রউফের বিরুদ্ধে দেওয়া অভিযোগপত্রে তাঁর কথিত ডেভেলপার ব্যবসায় সম্পৃক্ততা, ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, ব্যাংক লেনদেন, আয়-ব্যয়ের হিসাব, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক খতিয়ে দেখার অনুরোধ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, সংশ্লিষ্ট নথি, ভিডিও, যোগাযোগের তথ্য ও আর্থিক লেনদেন যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসতে পারে।