সরকারি চাকরিতে অবসরের বয়স পেরিয়ে গেলেও দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) ভাইস প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ডা. মোশাররাত সুলতানা সুমি। তার জন্মতারিখ ১৯৬৭ সালের ৮ আগস্ট। সে হিসাবে চলতি বছরের ৮ আগস্ট তার চাকরির নির্ধারিত বয়স শেষ হয়েছে। তার ব্যক্তিগত চাকরির তথ্যেও ৮ আগস্ট ২০২৬ তারিখকে অবসরের পরবর্তী ছুটির (পিআরএল) তারিখ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এরপরও তিনি ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অভিযোগ উঠেছে, চাকরির নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সরকারি বিধি অনুযায়ী পুনঃনিয়োগ বা মেয়াদ বাড়ানোর কোনো কার্যকর আদেশ না থাকলেও তিনি ভাইস প্রিন্সিপাল পদের পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এমনকি গত ২৩ আগস্ট সুইডেন দূতাবাসের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সফরে এলে হাসপাতালের পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কার্যক্রমে তাকে অংশ নিতে দেখা যায়। এ সময় তিনি পূর্ববর্তী প্রশাসনিক পদের পরিচয়েই প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর যদি কোনো বৈধ মেয়াদ বৃদ্ধি, পুনঃনিয়োগ কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমোদন না থাকে, তাহলে তিনি কোন প্রশাসনিক বা আইনগত ক্ষমতাবলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করে বিদেশি দূতাবাসের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে অংশ নিয়েছেন?
অভিযোগকারীরা বলছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত প্রভাব, প্রশাসনিক ক্ষমতা বা পূর্ববর্তী পদমর্যাদার ভিত্তিতে সরকারি পদ ব্যবহারের সুযোগ থাকা উচিত নয়। একজন সরকারি কর্মকর্তার চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি কোন আইন, বিধি বা সরকারি আদেশের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করছেন, তা জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।
কর্মজীবনে শাস্তি হিসেবে অধ্যাপক ডা. মোশাররাত সুলতানা সুমি কয়েক দফা ওএসডি করা হয়। প্রথমবার ২০০৩ সালের ৩০ জুলাই থেকে ২০০৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি নিয়মিত ওএসডি হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ন্যস্ত ছিলেন। এরপর দ্বিতীয়বার ২০০৯ সালের ১৮ আগস্ট থেকে ২০১৫ সালের ৯ নভেম্বর পর্যন্ত স্টাডি ডেপুটেশনের অধীনে ওএসডি হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ন্যস্ত ছিলেন।
এদিকে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর দ্বাদশ অধ্যায়ে সরকারি কর্মচারীর অবসর গ্রহণের বিষয়ে বিধান রয়েছে। আইনের ৪৩ ধারার উপধারা (১)-এ বলা হয়েছে, একজন সরকারি কর্মচারী তার বয়স ৫৯ বছর পূর্তিতে অবসর গ্রহণ করবেন। আর একজন মুক্তিযোদ্ধা সরকারি কর্মচারী ৬০ বছর বয়স পূর্তিতে অবসর গ্রহণ করবেন। একই ধারায় মুক্তিযোদ্ধা কর্মচারীর মুক্তিযোদ্ধা সনদ বা পরিচিতি যাচাইয়ের বিষয়েও বিধান রয়েছে।
ডা. মোশাররাত সুলতানা সুমির ব্যক্তিগত চাকরির তথ্য অনুযায়ী, তার জন্মতারিখ ১৯৬৭ সালের ৮ আগস্ট। তার পিআরএল তারিখও ২০২৬ সালের ৮ আগস্ট উল্লেখ করা হয়েছে।
জানা যায়, ডা. মোশাররাত সুলতানার কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৯৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর মুকসুদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল অফিসার (নিয়মিত) হিসেবে। সেখানে যোগদানের পর ১৩ অক্টোবর ১৯৯৭ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৫ অক্টোবর ১৯৯৭ হোসেনপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য উপ-কেন্দ্রে মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগ দেন। সেখানে ২০০১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
এরপর ১২ ফেব্রুয়ারি ২০০১ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগ দেন। সেখানে ৩ সেপ্টেম্বর ২০০২ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২৫ জুলাই ২০০২ থেকে ২৯ জুলাই ২০০৩ পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সহকারী রেজিস্ট্রার (স্ত্রী ও প্রসূতিবিদ্যা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৩ সালের ৩০ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ওএসডি হিসেবে ন্যস্ত হন। প্রথম দফায় ২০০৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি ওএসডি ছিলেন। এরপর ৮ সেপ্টেম্বর ২০০৪ থেকে ৯ মে ২০০৬ পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সহকারী রেজিস্ট্রার (স্ত্রী ও প্রসূতিবিদ্যা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৬ সালের ৯ মে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেসিডেন্ট সার্জন (স্ত্রী ও প্রসূতিবিদ্যা) হিসেবে যোগ দেন। সেখানে ২০০৯ সালের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৪ জানুয়ারি ২০০৯ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জুনিয়র কনসালট্যান্ট (স্ত্রী ও প্রসূতিবিদ্যা) হিসেবে যোগ দেন। সেখানে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত চলতি দায়িত্বে ছিলেন।
এরপর ১৭ আগস্ট ২০০৯ নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা হাসপাতালে জুনিয়র কনসালট্যান্ট (স্ত্রী ও প্রসূতিবিদ্যা) হিসেবে যোগ দেন। সেখানে ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত চলতি দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যেই ২০০৯ সালের ১৮ আগস্ট থেকে ২০১৫ সালের ৯ নভেম্বর পর্যন্ত দ্বিতীয় দফায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ওএসডি ছিলেন। এবার তিনি স্টাডি ডেপুটেশনের অধীনে ওএসডি হিসেবে ন্যস্ত ছিলেন।
২০১৫ সালের ১৭ নভেম্বর সেন্ট্রাল পুলিশ হাসপাতালে জুনিয়র কনসালট্যান্ট (স্ত্রী ও প্রসূতিবিদ্যা) হিসেবে যোগ দেন। সেখানে ২০১৯ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২৪ জুন ২০১৯ স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে সহকারী অধ্যাপক (স্ত্রী ও প্রসূতিবিদ্যা) হিসেবে যোগ দেন। পদোন্নতি পেয়ে ২০২৪ সালের ২ মে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে সহযোগী অধ্যাপক (সাধারণ স্ত্রী ও প্রসূতিবিদ্যা) হিসেবে যোগ দেন।
সেখান থেকে বদলি হয়ে ২০২৬ সালের ১০ জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি এই পদেই দায়িত্ব পালন করছেন।
চাকরির বয়স শেষ হওয়ার পরও দায়িত্ব পালন করার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ডা. মোশাররাত সুলতানা সুমি দ্যা ঢাকা ডায়েরিকে বলেন, ‘আমি অবসরে যাইনি এখনও। দায়িত্ব পালন করছি।’
চলতি বছরের ৮ আগস্ট তার অবসরে যাওয়ার কথা থাকলেও তিনি এখনো দায়িত্বে রয়েছেন এবং সরকার তাকে নতুন করে নিয়োগ দিয়েছে কি না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. মোশাররাত সুলতানা সুমি বলেন, ‘সরকার এখনও আমাকে নতুন করে নিয়োগ দেয়নি। তবে আমি এ বিষয়ে আবেদন করেছি। বিষয়টি বর্তমানে সরকারের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’
বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অনুবিভাগ) এস এম আহসানুল আজিজ দ্য ঢাকা ডায়েরিকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছি। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি অ্যাড্রেস করা হচ্ছে। প্রশাসনিকভাবে যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, আমরা সেভাবেই ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
অধ্যাপক ডা. মোশাররাত সুলতানা সুমির সঙ্গে কথা হয়েছে জানিয়ে অতিরিক্ত সচিব বলেন, ‘আমরা তার সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি বলেছেন, তার এখনো চাকরি আছে এবং সরকার তাকে নতুন করে নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করছে। তবে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না বা বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত আমাদের কাছে আসেনি। সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত আইনে যেভাবে বলা আছে, সেভাবেই হবে। বিষয়টি আমরা দেখছি। প্রশাসনিকভাবে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন হলে, সে অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।