জাহিদুল আলম
চিঠির পরও নড়েনি ডিপিডিসি!
রাজধানীর ধলপুরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১০ নম্বর আবাসিক স্টাফ কোয়ার্টারে বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকা মিটারগুলোর সংযোগ বিচ্ছিন্নের জন্য লিখিতভাবে অনুরোধ জানানোর পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে পাঠানো একটি লিখিত চিঠিতে ওই কোয়ার্টারের ১৮০টি ফ্ল্যাটের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
চিঠিটি পাঠানো হয়েছে এনওসিএস মানিকনগর, ডিপিডিসির নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে। ফলে লিখিতভাবে বিষয়টি অবহিত হওয়ার পরও যদি বকেয়া সংযোগ বিচ্ছিন্ন না হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠছে—সরকারি রাজস্ব আদায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ভূমিকা কী ছিল?
চিঠির ভাষ্য অনুযায়ী, ১০ নম্বর আবাসিক স্টাফ কোয়ার্টারে মোট ১৮০টি ফ্ল্যাট রয়েছে এবং প্রতিটি ফ্ল্যাটের বিপরীতে ডিপিডিসি কর্তৃক বৈদ্যুতিক মিটার স্থাপন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিল আদায়ের স্বার্থে যেসব মিটারের বিপরীতে বকেয়া রয়েছে, সেসব মিটারের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, যেসব ফ্ল্যাটে বৈদ্যুতিক মিটার নেই, সেসব স্থানেও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রয়োজন রয়েছে।
লিখিত চিঠিই যখন প্রমাণ
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ডিপিডিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে বিষয়টি মৌখিকভাবে নয়, লিখিতভাবে জানানো হয়েছিল। এরপরও যদি সংযোগ বিচ্ছিন্ন না হয়ে থাকে, তাহলে এর কারণ কী?
চিঠিতে স্পষ্টভাবে বকেয়া বিদ্যুৎ বিল এবং সংযোগ বিচ্ছিন্নের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি চিঠিতে বলা হয়েছে, এর আগে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য ডিপিডিসির কাছে পত্র পাঠানো হয়েছিল।
অর্থাৎ, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অজানা ছিল—এমন দাবি করার সুযোগও সীমিত হয়ে যায়।
তাহলে ব্যবস্থা কোথায়?
এনওসিএস মানিকনগরের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহিমের দায়িত্বাধীন এলাকায় এই চিঠি পাওয়ার পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল—এখন সেটিই তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত।
কতটি মিটার পরিদর্শন করা হয়েছে?
কতটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে?
কত টাকা বকেয়া রয়েছে?
বকেয়া আদায়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
আর কোনো সংযোগ অবৈধভাবে চালু থাকলে তা বন্ধ করা হয়নি কেন?
এসব প্রশ্নের জবাব এখন প্রয়োজন।
‘লাইন কাটতে গেলে চড়াও হতে পারে’—তাহলে প্রশাসনিক সহায়তা নেওয়া হলো না কেন?
এর আগে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এনওসিএস মানিকনগরের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহিম বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, সেখানে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে সংশ্লিষ্টরা ডিপিডিসির লোকজনের ওপর চড়াও হতে পারে।
নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কা থাকলে সেটি অবশ্যই গুরুত্ব পাওয়ার বিষয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা চেয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না?
সরকারি রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকলে প্রশাসনের সহায়তা নেওয়াই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু প্রশাসনিক সহায়তা চাওয়া হয়ে থাকলে তার প্রমাণ কোথায়, আর না চাওয়া হয়ে থাকলে কেন চাওয়া হয়নি—সেটিও তদন্তের বিষয়।
দুই সংস্থার চিঠি চালাচালি, ক্ষতি সরকারি কোষাগারের
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিদ্যুৎ বিভাগের তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বজলুর রহমান জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে ডিপিডিসিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ডিপিডিসির সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী ওহিদুজ্জামান বলেছেন, সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সহযোগিতা করলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা সহজ হবে।
দুই সংস্থার বক্তব্যে সহযোগিতার ঘাটতির বিষয়টি সামনে এলেও ১৮০টি ফ্ল্যাটের বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের দায় শেষ পর্যন্ত সরকারি রাজস্বের ওপরই পড়ছে।
অনুসন্ধানের দাবি
চিঠির ভিত্তিতে এখন ডিপিডিসির সংশ্লিষ্ট নথি পরীক্ষা করলেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত চিত্র—
১৮০টি মিটারের মধ্যে কতটি মিটারে বকেয়া?
মোট বকেয়ার পরিমাণ কত?
কতদিন ধরে বকেয়া?
কোন কোন মিটার এখনো চালু?
চিঠি পাওয়ার পর কতটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে?
কোনো সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করে থাকলে তার লিখিত কারণ কী?
এ বিষয়ে ডিপিডিসির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সরেজমিন তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে এনওসিএস মানিকনগরের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহিমের দপ্তরে চিঠি পাওয়ার পর কী কার্যক্রম নেওয়া হয়েছিল, তার নথিও প্রকাশ্যে আনা উচিত।
নথি বলছে: ধলপুর ১০ নম্বর আবাসিক স্টাফ কোয়ার্টারের ১৮০টি ফ্ল্যাটের বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের বিষয়ে ডিপিডিসিকে লিখিতভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।