দুই ভবনের মেরামত বিল ২৫ লাখ টাকা, কিছুই জানে না বাসিন্দারা

আপলোড সময় : ১১-০৯-২০২৬ ১২:৪০:৪৮ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১১-০৯-২০২৬ ১২:৪০:৪৮ অপরাহ্ন
রাজধানীর পুরান ঢাকার পলাশী সরকারি আবাসিক কলোনির ১ ও ২ নম্বর ভবন। এই দুই ভবনের প্লাস্টার ও রং করা, মরিচা ধরা স্টিলের জানালা পরিবর্তন, কলাপসিবল গেট স্থাপন, ছাদের ছিদ্র বন্ধ করাসহ নানা ধরনের সংস্কারকাজ বাবদ ২৫ লাখ টাকা বিল জমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরেজমিন ঘুরে ও লোকজনের সঙ্গে কথা বলে সংস্কারকাজের খুব সামান্য সত্যতাই পাওয়া গেছে। এভাবে অবাস্তব ও ভুয়া বিল জমা দিয়ে রাজধানীর আজিমপুর ও পলাশী এলাকার আবাসিক ভবন মেরামতের নামে বিপুল পরিমাণ টাকা ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের (পিডব্লিউডি) আজিমপুর বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও সামান্য কাজ করা হয়েছে। আবার কোথাও কোনো ধরনের কাজ না করেই বিল করা হয়েছে। সম্প্রতি সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের অনুসন্ধানে এবং সরেজমিন ঘুরে কাজের সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ৯১টি আবাসিক ভবন ও ১০টি অনাবাসিক ভবনসহ মোট ১০১টি স্থাপনা মেরামত বাবদ আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগ ১৪ কোটি ৫০ টাকার একটি বিল জমা দিয়েছে। গত বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে পলাশী সরকারি কলোনিতে গিয়ে দেখা যায়, ১ নম্বর ভবনের প্রবেশ পথে ভেঙে যাওয়া পাইপ দিয়ে পানি পড়ছে। সে পানি সরাসরি খোলা ড্রেনে গিয়ে পড়ছে। ভেতরে ঢোকার কলাপসিবল গেটের একটি অংশ ভাঙা। গত এক বছর-দেড় বছরের মধ্যে ভবনটিতে কোনো ধরনের মেরামত কাজ হয়েছে বলে মনে হয়নি। ১ নম্বর ভবনের ১/১ নম্বর ফ্ল্যাটের এক বাসিন্দা বলেন, প্রায়ই পলেস্তারা (প্লাস্টার) খসে পড়ে। বছর দুই আগে এই ভবনে সামান্য একটু রঙের কাজ করা হয়েছিল। পলাশী সরকারি কলোনির ২ নম্বর ভবনের সামনে কথা হয় নিচতলার বাসিন্দা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাসার ঢোকার পথে পাইপ ফেটে সবসময় পানি পড়ছে। ছাদের পলেস্তারা প্রায়ই খসে পড়ছে। পিডব্লিউডি কোনো কাজই করে নাই। সামান্য একটু রং মাইরা দিয়ে চইল্যা গ্যাছে। ফাটা পাইপ দিয়ে বের হওয়া মলমূত্র খোলা ড্রেনে যাচ্ছে। এই ভবন মানুষের বসবাস যোগ্য নয়।’ মেরামত কাজের মান নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। পলাশী সরকারি কলোনির উত্তরপাশে সীমানাপ্রাচীর পুনর্নির্মাণ বাবদ সাত লাখ ৫০ হাজার টাকার বিল ধরা হয়েছে। কিন্তু সেখানে কোনো সীমানাপ্রাচীর পুনর্নির্মাণের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। কাগজে-কলমে বিভিন্ন ফ্ল্যাটে সংস্কারকাজ করার বিষয়টি থাকলেও বাস্তবে তার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সি জোনের বাসিন্দারা বলেন, গত ১৮ মাস ধরে তাদের এই জোনে সব ধরনের মেরামত কাজ বন্ধ রয়েছে। ৩৯ নম্বর ভবনের এক বাসিন্দা জানান, তিনি নিজ খরচে স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করেছেন। ৪২/৩ নম্বর ভবনের এক বাসিন্দা বলেন, তাদের এলাকায় দুই বছর ধরে সব ধরনের কাজই বন্ধ। তাহলে এত টাকা বিল কীভাবে আসলো। ৩৯ নম্বর ভবনের প্রবেশ পথে মানুষের মলের স্তূপ দেখা যায়। আশপাশের পরিবেশ খুবই নোংরা। অথচ এই ভবন মেরামত বাবদ জমা দেওয়া গণপূর্তের বিলে লেখা রয়েছে, বিভিন্ন ফ্ল্যাটের নষ্ট হয়ে যাওয়া স্যানিটারি ফিটিংস পরিবর্তন, জানালার ভাঙা কাচ পরিবর্তনসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ বাবদ তিন লাখ টাকার বিল করা হয়েছে। এই কলোনির ৪১/৩ নম্ব ফ্ল্যাটের নষ্ট স্যানিটারি ফিটিংস পরিবর্তন, জানালার ভাঙা কাচ পরিবর্তনসহ অন্যান্য কাজ বাবদ তিন লাখ টাকা বিল ধরা হয়েছে। তালিকার ৮১ নম্বরে লেখা রয়েছে ৪১/১, ৪১/২ ও ৪১/৩ বিভিন্ন ফ্ল্যাটে বদলিজনিত কারণে জরুরি প্রয়োজনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ বাবদ এক লাখ ৪০ হাজার টাকার বিল ধরা হয়েছে। তালিকার ২২৭ নম্বরে থাকা আজিমপুর জোন–বি ২ নম্বর ভবনের বাইরে প্লাস্টার মেরামত এবং ভাঙা থাই গ্লাস প্রতিস্থাপন, স্যানিটারি ফিটিংস এবং পানির লাইনের সংস্কারসহ বিভিন্ন মেরামত কাজের জন্য ১৫ লাখ টাকার বিল ধরা হয়েছে। আবার তালিকার ১০১ নম্বর বিলে থাকা একই ভবনের পিভিসি পাইপ পরিবর্তনসহ অভ্যন্তরীণ স্যানিটারি মেরামত এবং পানির লাইনের সংস্কারকাজে ৮ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। অর্থাৎ এই ভবনের মেরামত খরচ বাবদ দুই ধাপে ২৩ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। ২ নম্বর ভবনের বাসিন্দা মামুন হোসেন বলেন, ২০১৮ সালের তিনি ওই ভবনে ওঠেন। ওঠার পর একবার কোনোমতে রং-চুনের কাজ হয়েছে। কিন্তু পিভিসি পাইপ কিংবা স্যানিটারি ফিটিংস ও থাই গ্লাস পরিবর্তন করা হয়নি। ভবনের নিরাপত্তা প্রহরী বলেন, তিনি দুই-তিন বছর আগে রং-চুন করতে দেখেছেন। গত বুধবার ওই ভবনের তিনপাশ পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, কোনো থাই গ্লাস পরিবর্তন হয়নি। কোথাও পানির পাইপ সংস্কার করা হয়নি। ভবনের সামনে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন স্লোগান লেখা রয়েছে। ভবনের প্রবেশ পথের দেয়ালের পলেস্তারা ওঠে গেছে। তালিকার ৮৯ নম্বরের বিলে বলা আছে, ৫ ও ৬ নম্বর ভবনে স্যুয়ারেজ লাইন সংস্কার ও মেরামত বাবদ ৬ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। তালিকার ১৯২ নম্বর বিলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বাবদ ৮ লাখ টাকা বিল ধরা হয়েছে। তালিকার ১৯৩ নম্বর বিলে ৫ ও ৬ নম্বর ভবনের বিভিন্ন ফ্ল্যাটের স্যানিটারি ফিটিংস প্রতিস্থাপন ও মেরামত বাবদ আরও ৮ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। তালিকার ১৮৩ নম্বর বিলে ৫, ৬, ১৬ ও ১৭ নম্বর ভবনে নষ্ট অ্যালুমিনিয়াম থাই নেট ও জানালা মেরামত বাবদ ৬ লাখ টাকা, ১৯৭ নম্বর বিলে ৫,৬, ৭, ৯, ১১, ১৬ ও ১৭ নম্বর ভবনে স্থাপিত পাইপ মেরামত বাবদ ৫ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। তবে কোন কোন ফ্ল্যাটে মেরামত কাজ বা স্যানিটারি ফিটিংস প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, সে সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই। এ বিষয়ে ৬ নম্বর ভবন পরিচালনা কমিটির সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান বলেন, স্যুয়ারেজ লাইনের সমস্যা হওয়ায় গত অর্থবছরে সেখানে সংস্কার কাজ করা হয়েছে। পানিতে দুর্গন্ধ থাকায় সরবরাহ লাইনের পাইপ খুড়ে মেরামত করা হয়। এছাড়া কিছু ফ্ল্যাটে রং–চুনের কাজ হয়েছে। বাকি বিষয়গুলো তার জানা নেই। কাজ না করেই বিল জমা দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে গতকাল বৃহস্পতিবার পক্ষ থেকে গণপূর্তের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ঢাকা জোন) মে. আবুল খায়েরের মুঠোফোনে একাধিবার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি। এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি। একই বিষয়ে পক্ষ থেকে গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ মনিরুজ্জামানের (ঢাকা সার্কেল ৪) সঙ্গে তার মুঠোফোনে গতকাল বৃহস্পতিবার কথা বলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনিও ফোন ধরেননি। পরে তার মুঠোফোনে খুদেবার্তা পাঠিয়ে এ বিষয়ে জানতে চাইলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

সম্পাদকীয় :

উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য : ডাঃ মোঃ হাফিজুর রহমান
সম্পাদক : তোফাজল আহমেদ ফারুকী
ব্যাবস্থাপনা সম্পাধক : আব্দুল্লাহ রানা সোহেল
প্রকাশক : মোঃ সোহেল রানা
বার্তা সম্পাদক : মোঃ আব্দুল কাদের জিলানী
প্রধান প্রতিবেদক : হাসিবুর রহমান হাসিব 

যোগাযোগের ঠিকানা :

লাবিনা এপার্টমেন্টে # বাড়ি এ-৩, রোড # ০৮, সেক্টর #০৩,উত্তরা
উত্তরা মডেল টাউন -ঢাকা -১২৩০, বাংলাদেশ

মোবাইল :  ০১৭১৭-৬৭৬৬৬৪

ই-মেইল :  dailyvoicenews247@gmail.com