নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকারি চাকরিতে থেকে বেসরকারি আবাসন ব্যবসায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আব্দুর রউফের বিরুদ্ধে। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ভবনের ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির সঙ্গে কথিত যোগাযোগ, ডেভেলপার ব্যবসায় সম্পৃক্ততা এবং আর্থিক লেনদেনের বিষয় তদন্তের দাবি জানিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
গত ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ দুদক চেয়ারম্যান বরাবর দেওয়া অভিযোগে আব্দুর রউফের কথিত ডেভেলপার ব্যবসায় সম্পৃক্ততা, ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, ব্যাংক লেনদেন, আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়।
ফ্ল্যাট বিক্রির কথোপকথনের অভিযোগ
অভিযোগকারীর দাবি, আব্দুর রউফকে মোবাইল ফোনে কোনো ভবনের কোন তলার কোন ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি করা হবে—এমন বিষয়ে কথা বলতে শোনা গেছে।
এখানেই উঠছে মূল প্রশ্ন—একজন সরকারি প্রকৌশলী কেন ব্যক্তিগত আবাসন প্রকল্পের ফ্ল্যাট বিক্রির বিষয়ে সম্ভাব্য ক্রেতা বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন?
তবে কথোপকথনটি কার সঙ্গে, কোন প্রকল্পের বিষয়ে এবং এর সঙ্গে কোনো আর্থিক লেনদেন জড়িত ছিল কি না—তা নিশ্চিত করতে মূল অডিও/ভিডিও, কলের প্রেক্ষাপট এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই করা প্রয়োজন।
ওয়াশপুর টাওয়ারের অফিস ঘিরে প্রশ্ন
দুদকে দেওয়া অভিযোগে মোহাম্মদপুরের ওয়াশপুর টাওয়ারের একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের ঠিকানার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে ঠিকানা হিসেবে দেওয়া হয়েছে—অফিস-২, ১৮/৪, নিচতলা, ওয়াশপুর টাওয়ার, ওয়াশপুর, মোহাম্মদপুর-বসিলা ব্রিজসংলগ্ন, ঢাকা।
অভিযোগকারীর দাবি, এই ঠিকানার সঙ্গে আবাসন ব্যবসার কার্যক্রমের সম্পর্ক রয়েছে। তবে আব্দুর রউফ ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক, অংশীদার, কর্মী, প্রতিনিধি বা কেবল পরিচিত—কোন ভূমিকায় ছিলেন, সেটি কোম্পানির রেজিস্ট্রেশন, মালিকানা ও আর্থিক নথি যাচাই ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
ডেভেলপার নেটওয়ার্কে যোগাযোগের অভিযোগ
অভিযোগে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় ভবন নির্মাণ এবং ফ্ল্যাট বিক্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ডেভেলপার নেটওয়ার্কের কথাও বলা হয়েছে। আব্দুর রউফের সঙ্গে এই নেটওয়ার্কের কী ধরনের সম্পর্ক ছিল, তিনি কোনো প্রকল্পে কমিশন বা আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন কি না—তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার তালিকা, ট্রেড লাইসেন্স, প্রকল্পের নথি, ফ্ল্যাট বিক্রির রসিদ, ব্যাংক হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক লেনদেন যাচাই করলেই অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
সরকারি চাকরি ও ব্যবসা—স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা সরকারি নির্মাণকাজের প্রাক্কলন, তদারকি ও বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। ফলে একই সময়ে কোনো কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে নির্মাণ বা আবাসন ব্যবসায় জড়িত থাকলে সেখানে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠতে পারে।
এ কারণে আব্দুর রউফ কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না, থাকলে কী পদে ছিলেন, কোনো অনুমোদন নিয়েছিলেন কি না এবং ব্যবসা থেকে কোনো আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন কি না—এসব বিষয় যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।
দুদকের কাছে যেসব তথ্য যাচাইয়ের দাবি
অভিযোগে আব্দুর রউফের—
ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক;
ফ্ল্যাট বিক্রির কথিত যোগাযোগ;
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন;
ব্যাংক হিসাব ও অর্থের উৎস;
আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য;
স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ;
কোম্পানি বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে মালিকানা/অংশীদারত্ব;
পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে কোনো ব্যবসায়িক স্বার্থ গোপন রাখা হয়েছে কি না—
এসব বিষয় অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে।
প্রমাণ যাচাই হলেই বেরিয়ে আসবে প্রকৃত চিত্র
আব্দুর রউফের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কথিত ফ্ল্যাট বিক্রির যোগাযোগ এবং ডেভেলপার ব্যবসার সঙ্গে তাঁর প্রকৃত সম্পর্ক। এসব বিষয়ে মূল অডিও-ভিডিও, কোম্পানির নথি, ফ্ল্যাট বিক্রির কাগজপত্র এবং আর্থিক লেনদেন পাওয়া গেলে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সহজ হবে।
তবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আব্দুর রউফকে দোষী বলা যায় না। তাঁর বক্তব্য, গণপূর্ত অধিদপ্তরের অবস্থান এবং দুদকের অনুসন্ধানের ফলাফলই নির্ধারণ করবে অভিযোগগুলোর বাস্তব ভিত্তি কতটা।