বিশেষ প্রতিবেদক :
গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ মো. তানভীর আলমকে ঘিরে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আজিমপুর ই/এম বিভাগ-৩-এ দায়িত্ব পালনকালে লিফট স্থাপন, মেকানিক্যাল কার পার্কিং শেড, বৈদ্যুতিক রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন কাজে অনিয়মের অভিযোগ এবং তদন্ত প্রতিবেদন সামনে আসার পরও তিনি কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও পদোন্নতির সুযোগ পেয়েছেন—এ প্রশ্ন এখন সংশ্লিষ্ট মহলে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের সরকারি ওয়েবসাইটেও নিয়াজ মো. তানভীর আলমের নাম নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পাওয়া যায়।
অভিযোগের পরও পদোন্নতি—নথি যাচাইয়ের দাবি
অভিযোগ রয়েছে, আজিমপুরে দায়িত্ব পালনকালে তার অধীন বিভিন্ন প্রকল্প ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে অনিয়মের বিষয় সামনে আসে। বিশেষ করে ৬৮টি লিফট স্থাপনের দরপত্র এবং মেকানিক্যাল কার পার্কিং শেড নির্মাণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
কার পার্কিং শেড নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ডিপিপির অনুমোদিত ধারণক্ষমতা ২৮৮ গাড়ির পরিবর্তে ২৪০ গাড়ির জন্য স্থাপনা নির্মাণ এবং যথাযথ অনুমোদনের আগে পরবর্তী কাজের জন্য দরপত্র ও চুক্তি সম্পাদনের বিষয়টি সমীচীন হয়নি বলে মত দেওয়া হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—এই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর তানভীর আলমের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না। যদি ব্যবস্থা না হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তীতে তার পদোন্নতি বা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে অভিযোগগুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
লিফট প্রকল্পে দরপত্র নিয়ে প্রশ্ন
আজিমপুর ও মতিঝিল সরকারি কলোনিতে ৬৮টি লিফট স্থাপনের দরপত্রে রওশন এলিভেটরসকে কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, দরপত্রের নির্ধারিত যোগ্যতা, প্রস্তুতকারকের অভিজ্ঞতা, গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং সার্টিফিকেশনসহ বিভিন্ন শর্ত যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি।
এক্ষেত্রে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির কার্যবিবরণী, টেকনিক্যাল কমিটির প্রতিবেদন, রেসপনসিভ/নন-রেসপনসিভ নির্ধারণের কারণ এবং কার্যাদেশের নথি প্রকাশের দাবি উঠেছে।
রক্ষণাবেক্ষণ খাতে কোটি কোটি টাকা
আজিমপুর ই/এম বিভাগ-৩-এর রক্ষণাবেক্ষণ খাতেও বিপুল অর্থ ব্যয়ের তথ্য রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কয়েক বছরে কোটি কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হলেও সব কাজ বাস্তবে হয়েছে কি না, তা সরেজমিন যাচাই করা হয়নি।
বিশেষ করে বৈদ্যুতিক কাজ, ফায়ার-সেফটি, সাবস্টেশন, বাসাবাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিভিন্ন মেরামতকাজের বিল-ভাউচার, পরিমাপ বই ও কাজের বাস্তব অবস্থার মধ্যে মিল রয়েছে কি না—তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
অবৈধ সম্পদের অভিযোগ—কোথায় কত সম্পদ?
তানভীর আলমের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ হলো—সরকারি চাকরি থেকে অর্জিত বৈধ আয় ও ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে তার এবং পরিবারের নামে থাকা জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ি, ব্যাংক হিসাব ও অন্যান্য সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না।
এছাড়া তার নিজের, স্ত্রী বা নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব, সঞ্চয়পত্র, কোম্পানি শেয়ার, ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব ও অন্যান্য বিনিয়োগের উৎসও যাচাই করা প্রয়োজন।
দুদকের অনুসন্ধানের দাবি
অভিযোগগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় তানভীর আলমের—
গণপূর্তের দেয়া রেট সিডিউল থেকে রওশন এলিভেটরস প্রায় ১৯ শতাংশ ডিসকাউন্ট দিয়ে দরপত্র দাখিল করেছে যা অস্বাভাবিক। গণপূর্তের বেঁধে দেয়া রেটের চেয়ে প্রায় ১৯ শতাংশ কম দামে মানসম্মত লিফট স্থাপন করা হয়েছে।
চাকরিজীবনের আয় ও সম্পদ বিবরণী;
পদোন্নতি ও পদায়নের নথি;
আজিমপুর ই/এম বিভাগে দায়িত্বকালীন সব বড় প্রকল্প;
৬৮টি লিফটের দরপত্র ও কার্যাদেশ;
কার পার্কিং শেডের তদন্ত প্রতিবেদন;
রক্ষণাবেক্ষণ খাতের বিল-ভাউচার;
ব্যাংক হিসাব ও বিনিয়োগ;
নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা জমি-ফ্ল্যাট;
কোম্পানি বা ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা;
আয়কর রিটার্নের সঙ্গে বাস্তব সম্পদের সামঞ্জস্য
যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সরকারি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের ক্ষতি হয়ে থাকলে তা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি উঠেছে।