জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পকে ঘিরে অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য ও স্বজনপ্রীতি করে বিশাল প্রভাবের এক ‘অদৃশ্য কাঠামো’ গড়ে তোলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে উপ-সহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন সিকদারের বিরুদ্ধে। পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, নিজের স্ত্রীর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ বাগিয়ে তা অন্যের কাছে বিক্রি এবং বিল ছাড় করাতে কমিশন দাবিসহ নানা অভিযোগে এখন তোলপাড় অধিদপ্তর।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের দাবি, নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পের প্রাক্কলন (এস্টিমেট) ও দরপত্র প্রক্রিয়ায় আনোয়ার হোসেনের প্রভাব এতটাই শক্তিশালী যে, প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পরিবর্তন হলেও তার আসনে কোনো পরিবর্তন আসেনি। দীর্ঘদিন একই পদে বহাল থাকার সুবাদে প্রকল্পের কারিগরি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ওপর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি।
আগে কাজ নির্ধারিত, পরে তৈরি হতো প্রাক্কলন
অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এই প্রকল্পে প্রচলিত সরকারি নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে আগে থেকেই নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ নিশ্চিত করা হতো। কাজ ঠিক হওয়ার পর সেই অনুযায়ী তৈরি করা হতো প্রাক্কলন বা এস্টিমেট। অর্থাৎ ‘আগে কাজ, পরে এস্টিমেট’—এমন একটি নিয়মবহির্ভূত অলিখিত চর্চা চালু করেছিলেন এই কর্মকর্তা।
স্ত্রীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও ‘কাজ বিক্রি’
অনুসন্ধানে জানা যায়, ‘মেসার্স ওহি ট্রেডার্স’ নামে একটি প্রথম শ্রেণির ঠিকাদারি ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্ত এই প্রতিষ্ঠানটি যশোর ও চাঁদপুরে গ্রাউন্ড ওয়াটার বিভাগের বেশ কয়েকটি কাজ বাগিয়ে নেয়।
পরবর্তীতে চুক্তিপত্র, কার্যাদেশ ও ব্যাংক লেনদেনের নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ওহি ট্রেডার্স কাজ পাওয়ার পর সেগুলো বাস্তবায়ন না করে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে অন্য ঠিকাদারদের কাছে হস্তান্তরিত বা ‘হাতবদল’ করা হতো। সরকারি প্রকল্পের প্রাক্কলন তৈরির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার পরিবার সরাসরি একই প্রকল্পের ঠিকাদার হওয়ায় স্বার্থের দ্বন্দ্বের (Conflict of Interest) বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে।
বিল ছাড়াতে ২% কমিশন দাবি
ঠিকাদারদের একাংশের অভিযোগ, প্রকল্পের আওতায় সম্পন্ন কাজের বিল ছাড়ানোর ক্ষেত্রে আনোয়ার হোসেনকে বাধ্যতামূলকভাবে ২ শতাংশ হারে কমিশন দিতে হয়। এর বাইরেও প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কোনো কোনো প্রকল্প পরিচালক তার কথা না শুনলে তাদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব খাটানো হতো বলেও সংশ্লিষ্টরা জানান।
দশম গ্রেডের কর্মচারীর কোটি টাকার ফ্ল্যাট ও অঢেল সম্পদ
দশম গ্রেডের সরকারি কর্মচারী হিসেবে আনোয়ার হোসেনের মূল বেতন ৩৫ হাজার টাকার বেশি নয়। অথচ এই বেতনের একজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে রাজধানীতে কোটি টাকার ফ্ল্যাটসহ শতকোটি টাকার সম্পদ গড়ার অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের পিসিকালচার হাউজিংয়ের ‘খ’ ব্লকের ১ নম্বর সড়কের ৪০ নম্বর বাড়িতে আনোয়ারের পরিবারের একটি ১৫০০ বর্গফুটের অভিজাত অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাসূত্রে আনোয়ার হোসেন উক্ত ফ্ল্যাটে ভাড়ায় থাকার দাবি করলেও, পরবর্তীতে স্বীকার করেন যে ফ্ল্যাটটি তার স্ত্রীর নামে কেনা। বর্তমান বাজারমূল্যে গ্যারেজসহ এই ফ্ল্যাটের দাম এক কোটি টাকারও বেশি। এছাড়াও রাজধানীতে তার পরিবারের আরও একাধিক ফ্ল্যাট ও সম্পদের তথ্য রয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে।