এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই দশক আগে বরিশালের ভোলা থেকে ঢাকায় আসা এই ব্যক্তি একসময় সাভারের কাউন্দিয়া এলাকায় টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ চালাতেন এবং অপুর গলিতে ভাড়া থাকতেন। পুলিশ বিভাগে যোগ দেওয়ার পর থেকে ধাপে ধাপে তার নামে জমি, বাড়ি ও ফ্ল্যাটের সংখ্যা বাড়তে থাকে বলে স্থানীয়দের দাবি।
কর্মজীবনের পথ পরিক্রমা
জানা গেছে, চাকরিজীবনে মনজুরুল হোসেন বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি থানায় অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তীতে তাকে নাইক্ষ্যংছড়ি থানার অধীন বাইশারী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ (আইসি) হিসেবে বদলি করা হয়। তিনি সিআইডি মাদারীপুরে তদন্ত-শাখার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এই একাধিক কর্মস্থল পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই তার সম্পদের পরিধি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, তার সম্পদের তালিকা এতটাই দীর্ঘ যে সংক্ষেপে তুলে ধরাও কঠিন। প্রতিবেদনের সুবিধার্থে অনুসন্ধান শুরু হয় ঢাকা জেলার সাভার উপজেলার কাউন্দিয়া ইউনিয়ন থেকে।
কাউন্দিয়ায় বহুতল ভবন
স্থানীয়দের বরাতে জানা যায়, কাউন্দিয়া ইউনিয়নের ৯৩ নম্বর চেয়ারম্যান প্লাটে বসুন্ধরা এলাকা-সংলগ্ন একটি ছয়তলা ভবনের মালিক এই পুলিশ কর্মকর্তা। এলাকায় প্রচলিত আছে যে এই ভবন নির্মাণে প্রায় দশ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এই ভবনের ঠিক পেছনে, উত্তর কাউন্দিয়ার ২ নম্বর ওয়ার্ডের হোল্ডিং ৩৩/২-এ সালাম নামের এক ব্যক্তির তিন শতাংশ জমির উপর একটি পাকা টিনশেড ঘর এবং তার পাশে আরেকটি একতলা বাড়িও তিনি কিনে নিয়েছেন বলে অভিযোগ।
আরও ভূসম্পত্তির খোঁজ
বাঘসাত্রা মৌজার চান্দার টেক এলাকায় দ্বিতল একটি বাড়ির সাইনবোর্ডে মালিক হিসেবে মনজুরুল হোসেনের নামই লেখা রয়েছে। জাপান গলির শেষ প্রান্তে সীমানা-প্রাচীর ও গেট দেওয়া সাড়ে তিন শতাংশ জায়গাও তার মালিকানাধীন বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, তার এসব সম্পদের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকেন কখনো ছোট ভাই মাইনুল, কখনো স্থানীয়ভাবে আত্মীয় পরিচয় দেওয়া নয়ন, আবার কখনো সৎ ভাই আব্দুর রহমান। প্রায় দুই বছর আগে সেলিম মুন্সি রোড এলাকায় শফি হাজীর কাছ থেকে আরও তিন শতাংশ জমি কেনা হয় বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা দাবি করেছেন, সাইফুল চেয়ারম্যান নগর, ৩০ ফিট রোড, বালুর মাঠ এবং ১ ও ২ নম্বর শিট এলাকাতেও তার নামে কেনা আরও সম্পত্তি রয়েছে।
পাশাপাশি ব্যবসার অভিযোগ
সরকারি চাকরিবিধিতে স্পষ্টভাবে বলা আছে, প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী পাশাপাশি অন্য কোনো চাকরি বা ব্যবসায় জড়িত থাকতে পারবেন না। এই নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও মনজুরুল হোসেনের রিয়েল এস্টেট ব্যবসা এবং নিষিদ্ধ বালু-ভরাট কার্যক্রম-সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
এছাড়াও রাজধানীর রূপনগর আবাসিক এলাকায় থাকা একটি ফ্ল্যাটও তার মালিকানায় বলে জানা গেছে। এই সব সম্পদের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি মনজুরুল হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন এই সম্পদ আমার না। উল্টো প্রশ্ন করে বলেন কয়টকা বাড়ি থাকা কি অপরাধ? প্রতিবেদক তাকে প্রশ্ন করে যে বাড়ি থাকা অপরাধ নয় কিন্তু প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী হিসেবে বেতনের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ হওয়াটা অপরাধ। এরপর তিনি কৌশলে এড়িয়ে যান। তার একজন তথাকথিত ম্যানেজার আছে যে তার সমস্ত সম্পদ দেখাশোনা করে।
একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন অসংগতিপূর্ণ ও বিশাল সম্পদের উৎস কী, তা নিয়ে এলাকাবাসীর মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যেখানে বেতনের সাথে এসব সম্পদের কোনো সংগতি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, সেখানে বিষয়টির সঠিক তদন্ত হওয়া জরুরি বলে মনে করেন স্থানীয়রা। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উন্মোচন করবে—এমনটাই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের।