জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগমের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা এবং প্রশাসনিক দখলের অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিভাগীয় নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের পরামর্শে দপ্তর পরিচালনা করছেন তিনি। তাঁর এই বিতর্কিত কার্যক্রমে সহায়তাকারী হিসেবে উঠে এসেছে দুদকের মামলাভুক্ত ও একাধিক অভিযোগ থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. অলিউল ইসলাম এবং মোস্তফা হোসাইন ফুয়াদের নাম।
দুদকের আসামিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর অভিযোগ অনুসন্ধানে জানা যায়, দুদকের দুর্নীতির মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মো. অলিউল ইসলামকে মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও প্ল্যানিং শাখার নির্বাহী প্রকৌশলীর (চলতি দায়িত্ব) মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করেন চেয়ারম্যান। অলিউল ইসলাম ও মোস্তফা হোসাইন ফুয়াদ—উভয়েই ভূমি শাখায় প্রভাব বিস্তার ও পছন্দসই কাজ বাগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানের নিকটজন হিসেবে পরিচিত। সরকারি দাপ্তরিক সময়ের অধিকাংশ সময় অলিউল ইসলামকে চেয়ারম্যানের দপ্তরে অবস্থান করতে দেখা যায় এবং তিনি সরকারি গাড়িতেও চেয়ারম্যানের সফরসঙ্গী হন। অনিয়ম ও ঘুস-বাণিজ্যের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এ দুই কর্মকর্তা বর্তমান প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
৩ দিনের মাথায় স্বপদে পুনর্বহাল ও প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব গত ২৬ এপ্রিল ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের এক আদেশে অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মাদ হাবিবুরকে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তবে মাত্র ৩ দিনের মাথায় অজ্ঞাত শক্তিবলে পুনরায় পদে ফিরে আসেন ফেরদৌসী বেগম। অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতার দাপটে সিনিয়র অতিরিক্ত সচিবের পদ দখল করে বসেন তিনি। দপ্তর পরিচালনায় তিনি গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিবের সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে প্রাক্তন সচিব নজরুলের দিকনির্দেশনায় কাজ করছেন এবং মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে বেড়াচ্ছেন বলেও গুঞ্জন রয়েছে। তাঁর অপকর্মের বিরুদ্ধে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী সরব হলেই বদলি ও বরখাস্তের মুখে পড়তে হচ্ছে।
আইনি জটিলতা উপেক্ষা করে বিতর্কিত প্লট বরাদ্দ মিরপুর চিড়িয়াখানা রোডের ৩২টি বাণিজ্যিক প্লট বরাদ্দের বিজ্ঞপ্তিতে মারাত্মক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। আইনি মতামত, ক্ষেত্র তদন্ত ও কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়াই জরুরি ভিত্তিতে এ দরপত্র আহ্বান করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সুবিধা নিশ্চিত করতেই আইনি জটিলতায় ঢাকা ভূমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে সেকশন ১, ব্লক জি, হোল্ডিং নম্বর ১/১-এর ৩০ শতাংশ ভূমির ক্ষেত্রে চরম স্বজনপ্রীতি ও আইনি লঙ্ঘনের চিত্র সামনে এসেছে। তৎকালীন ভূমি মন্ত্রণালয়ের আদেশ (স্মারক নং-ভূঃ মঃ/শাঃ ১০/ঢাকা-৫৯/২০০১) এবং গেজেট অনুযায়ী উক্ত সম্পত্তি মৃত বন্দে আলীর অনুকূলে অবমুক্ত করার প্রক্রিয়াধীন ছিল। ওয়ারিশ জাহাঙ্গীর জানান, তাঁদের পার্ট ফাইল নম্বর ১০৬/১৩ অনুযায়ী ২০১৩ সাল পর্যন্ত খাজনা পরিশোধ এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির বৈধ সংযোগ বিদ্যমান রয়েছে। তা সত্ত্বেও এবং ২০১১ সাল থেকে উচ্চ আদালতে (রিট পিটিশন) আইনি নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকা অবস্থায় উক্ত শিল্প ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিকে বাণিজ্যিক প্লট হিসেবে দরপত্র প্রকাশ ও বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী ওয়ারিশগণ লিগ্যাল নোটিশ পাঠালেও গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ কোনো প্রতিকার করেনি।
উৎস ঘিরে নানা প্রশ্ন প্রশাসনিক অঙ্গনে ফেরদৌসী বেগমের মূল ক্ষমতার উৎস নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। এক পক্ষ বলছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছর ঢাকার বাইরে বদলি না হওয়া এবং তাঁর স্বামী ডিআইজি রেজাউল ইসলামের (পিপিএম) প্রশাসনিক প্রভাবই তাঁর প্রধান শক্তির ভিত্তি। অন্য পক্ষের মতে, রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে তিনি এই স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছেন। বিপুল অংকের রাজস্ব হারিয়ে সরকার লোকসানে পড়লেও বহাল তবিয়তে রয়েছেন এই বিতর্কিত কর্মকর্তা।