লুটপাট নাকি অব্যবস্থাপনা: বিপিসির ফাঁকা তহবিলের চূড়ান্ত মাশুল কি দিতে হবে জনগণকে?

৫৫ হাজার কোটির মুনাফা কোথায় গেল: মেগা প্রকল্প আর অডিট আপত্তির গোলকধাঁধায় বিপিসি

আপলোড সময় : ২৭-০৯-২০২৬ ১২:৪১:১৮ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৭-০৯-২০২৬ ১২:৪১:১৮ অপরাহ্ন





বিশেষ প্রতিনিধি –

কয়েক বছর আগেও যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ফিক্সড ডিপোজিট (FDR) করে রাখার জন্য পরিচিত ছিল, সেই বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এখন তীব্র তারল্য ও তহবিল সংকটে ভুগছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি তেল আমদানির বকেয়া বিল মেটাতে এবং নতুন এলসি (Letter of Credit) খুলতে সংস্থাটি এখন হিমশিম খাচ্ছে। সম্প্রতি জ্বালানি বিভাগে পাঠানো বিপিসির এক জরুরি চিঠিতে সংস্থাটি নিজেদের চরম আর্থিক সংকটের কথা স্বীকার করে সরকারের কাছে জরুরি ভর্তুকি ও শুল্ক ছাড়ের আবেদন জানিয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—২০১৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বিশ্ববাজারে তেলের দরপতনের সুবাদে প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি মুনাফা করা একটি শীর্ষ লাভজনক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে কীভাবে এই দেউলিয়া দশায় পৌঁছাল? অনুসন্ধান বলছে, বর্তমান সংকটের পেছনে যেমন রয়েছে বৈশ্বিক ও নীতিগত কারণ, তেমনি মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছে বছরের পর বছর ধরে চলা গভীর প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম, অস্বচ্ছতা এবং আর্থিক অব্যবস্থাপনা।
#মেগা প্রকল্পের ফাঁদে ‘উধাও’ রিজার্ভ ফান্ড

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিগত লাভজনক বছরগুলোতে বিপিসি সংকটের সময়ে ব্যাকআপ দেওয়ার মতো কোনো কার্যকর প্রাইস স্ট্যাবিলাইজেশন বা জেনারেল রিজার্ভ ফান্ড তৈরি করেনি। উল্টো বিপিসির নিজস্ব কোষাগার থেকে সরকারের বড় বড় মেগা প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ অর্থ ডাইভার্ট করা হয়েছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-২ (ERL Unit-2), সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (SPM) এবং বড় এলপিজি ট্যাংক টার্মিনাল স্থাপনের মতো অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে বিপিসিকে তার নিজস্ব তহবিল থেকে ১৫,৬৪০ কোটি টাকারও বেশি নগদ অর্থ সরাসরি খরচ করতে হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি এই মেগা প্রকল্পগুলো এখনো পুরোপুরি বাণিজ্যিক রিটার্ন দেওয়া শুরু না করায় বিপিসির কার্যকরী মূলধন (Working Capital) সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেছে।
# হাজার কোটি টাকার অডিট আপত্তি ও আর্থিক গরমিল

বিপিসির আর্থিক খতিয়ান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে সুশাসনের অভাব দীর্ঘদিনের। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) অডিট রিপোর্টে বিপিসির বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও হিসাবের গড়মিল ধরা পড়েছে।

বিপিসির ২০০৯-১০ থেকে ২০১১-১২ অর্থবছর পর্যন্ত অডিট আপত্তিতেই প্রায় ২,৫৯৭ কোটি টাকার হিসাবের গরমিল পাওয়ার তথ্য ceremony উঠে আসে। এছাড়াও, নিজস্ব ফান্ড ব্যাংকে অলস ফেলে রেখে অতিরিক্ত সুদে ব্যাংক থেকে ‘ওভারড্রাফট’ বা ঋণ নিয়ে খরচ করায় রাষ্ট্রের প্রায় ২৪৮ কোটি ৯০ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটিও একাধিকবার বিপিসির অভ্যন্তরীণ অডিট ব্যবস্থার অকার্যকারিতা এবং ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বহিঃস্থ (External) অডিট না করার নজিরবিহীন ঘটনায় তীব্র অসন্তোষ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছে।

#সহযোগী সংস্থায় জালিয়াতি ও দুদকের মামলা
শুধু নীতিগত সিদ্ধান্তই নয়, বিপিসির মাঠ পর্যায়ের সহযোগী বিতরণ কোম্পানিগুলোতে সরাসরি জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

* এসএওসিএল (SAOCL) কেলেঙ্কারি: বিপিসির সহযোগী প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (SAOCL)-এর তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ভুয়া ভাউচার ও জালিয়াতির মাধ্যমে কোম্পানির আয় গোপন করে প্রায় ১১৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে দুদক ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছে।
* ভুয়া আমদানি ভাউচার: লুব বেস অয়েল এবং এডিটিভস আমদানির নামে ভুয়া পেমেন্ট ভাউচার তৈরি করে সরবরাহকারীকে টাকা না দিয়ে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও নগদে আরও ২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা তুলে আত্মসাতের আরেকটি চাঞ্চল্যকর মামলা করেছে দুদক।

# মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা: এনবিআরের শুল্ক নীতি ও বৈশ্বিক চাপ
সামষ্টিক অর্থনীতির দিক থেকে বিপিসিকে বড় ধাক্কা দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) নতুন আমদানি শুল্ক নীতি। আগে জ্বালানি তেলের ওপর একটি নির্দিষ্ট ‘ট্যারিফ মূল্যে’ কর ধরা হতো। কিন্তু নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রকৃত ইনভয়েস বা ‘আমদানি মূল্যের’ (Ad Valorem) ওপর শুল্ক ও ভ্যাট আরোপ করায় করের বোঝা দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এর সাথে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের চড়া দাম এবং ডলার সংকটে এলসি খুলতে ব্যাংকগুলোর অস্বীকৃতি বিপিসির পিঠ দেওয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে।


#সংকটের চূড়ান্ত দায় কি জনগণের কাঁধেই?
আর্থিক ঘাটতি মেটাতে বিপিসি ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের নামে দফায় দফায় বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লাভজনক সময়ে যদি বিপিসি সঠিক আর্থিক সুশাসন বজায় রাখত, অডিট আপত্তির হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি বন্ধ হতো এবং মেগা প্রকল্পের নামে ফান্ডের টাকা ডাইভার্ট না করা হতো—তবে আজ সাধারণ জনগণকে এই সংকটের দায় নিতে হতো না।


রাষ্ট্রীয় এই জ্বালানি জায়ান্টকে দেউলিয়া দশা থেকে বাঁচাতে হলে এখন জরুরি ভিত্তিতে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনাল বা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি দ্বারা পুরো বিপিসির বিগত ১০ বছরের আর্থিক অডিট সম্পন্ন করা এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা সময়ের দাবি।

সম্পাদকীয় :

উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য : ডাঃ মোঃ হাফিজুর রহমান
সম্পাদক : তোফাজল আহমেদ ফারুকী
ব্যাবস্থাপনা সম্পাধক : আব্দুল্লাহ রানা সোহেল
প্রকাশক : মোঃ সোহেল রানা
বার্তা সম্পাদক : মোঃ আব্দুল কাদের জিলানী
প্রধান প্রতিবেদক : হাসিবুর রহমান হাসিব 

যোগাযোগের ঠিকানা :

লাবিনা এপার্টমেন্টে # বাড়ি এ-৩, রোড # ০৮, সেক্টর #০৩,উত্তরা
উত্তরা মডেল টাউন -ঢাকা -১২৩০, বাংলাদেশ

মোবাইল :  ০১৭১৭-৬৭৬৬৬৪

ই-মেইল :  dailyvoicenews247@gmail.com