রাজধানীর ভবন নির্মাণ নিয়ন্ত্রণে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম নিয়ে যখন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নকশা অনুমোদন, নির্মাণ তদারকি ও পরিদর্শন কার্যক্রমে অনিয়ম, ঘুষ-দুর্নীতি এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে অভিযান চালিয়েছে, ঠিক সেই সময় রাজউকের অথরাইজড অফিসার মো. ইলিয়াস হোসেনকে ঘিরে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক অভিযোগটি রাজধানীর সূত্রাপুরের মালাকারটোলাকে ঘিরে। সেখানে রাজউকের মোবাইল কোর্ট অভিযান চালিয়ে নির্মাণসংক্রান্ত অনিয়ম শনাক্ত করে মিটার জব্দ করার পরও ভবনটির নির্মাণকাজ ফের চলার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দার লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়েছে। অথরাইজড অফিসার ইলিয়াস হোসেন নিজেই জানিয়েছেন, ওই ভবনে একবার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে মিটার জব্দ করা হয়েছিল এবং পুনরায় বিধিবহির্ভূত নির্মাণ হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে মূল প্রশ্ন—অভিযানের পরও যদি একই ভবনে নির্মাণকাজ চলতে থাকে, তাহলে রাজউকের অভিযান, নজরদারি ও পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থার কার্যকারিতা কোথায়?
মিটার জব্দ, তারপরও নির্মাণ
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মালাকারটোলার ওই ভবনে রাজউকের অভিযানের পর মিটার জব্দ করা হয়। ইমারত পরিদর্শক রাফিউল আলমও মোবাইল কোর্টে অনিয়ম পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। অথচ পরবর্তী সময়ে ভবনটিতে নির্মাণকাজ চলমান থাকার অভিযোগ ওঠে। মিটার পুনরায় ব্যবহারের বিষয়ে রাজউকের পক্ষ থেকে আদালতের আদেশ থাকার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ২৩ এপ্রিল স্থানীয় বাসিন্দা দিলীপ কুমার দাস জোন-৭ কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসার পরও যদি নির্মাণ অব্যাহত থাকে, তাহলে অভিযানের পরবর্তী পর্যায়ের তদারকি ও দায়িত্ব বণ্টন এখন তদন্তের দাবি রাখে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রায় ২০ লাখ টাকার কথিত গোপন সমঝোতার অভিযোগও সামনে এসেছে।
নোটিশ যায়, ব্যবস্থা আসে না-অভিযোগ বহু পুরোনো
ইলিয়াসকে ঘিরে অভিযোগ শুধু মালাকারটোলায় সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, তাঁর দায়িত্বাধীন এলাকায় অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে নোটিশ দেওয়ার পর দীর্ঘ সময় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নোটিশ ‘গায়েব’ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবেদনে ফার্মগেটের তেজতুরী বাজারের দুটি ভবন, পূর্ব রাজাবাজারের একটি ভবন এবং ধানমন্ডি-কলাবাগানের একটি ভবনের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়।
ওই প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, কলাবাগানের একটি নোটিশ ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নিউ এলিফ্যান্ট রোডের কয়েকটি ভবন নিয়ে মোবাইল কোর্টের পরও নির্মাণ ও ব্যবহার চলার অভিযোগ এবং সেখানে ৩৫ লাখ টাকার আর্থিক সমঝোতার দাবিও প্রকাশিত হয়।
তবে অভিযোগগুলোর ধরন একই জায়গায় গিয়ে মেলে—নোটিশ, অভিযান, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নকরণ এবং পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্যবর্তী পর্যায়ে কী ঘটে?
২০২১ সালেও একই কর্মকর্তাকে ঘিরে অভিযোগ
ইলিয়াসের বিরুদ্ধে অভিযোগের ধারাবাহিকতা আরও পেছনে যায়। ২০২১ সালের একটি প্রতিবেদনে রাজউকের জোন-৬-এর সহকারী অথরাইজড অফিসার মো. ইলিয়াসের বিরুদ্ধে নকশা অনুমোদন ও বদলির জন্য ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে একজন আবেদনকারী তিন দফায় মোট ১০ লাখ টাকা দেওয়ার অভিযোগ করেন। একই প্রতিবেদনে ইলিয়াসের বিরুদ্ধে অনুমতি ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ ও দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিতির বিষয়ে বিভাগীয় মামলার তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছিল।
উচ্ছেদ অভিযানও কি ‘লেনদেনের সুযোগ’
আরেকটি প্রকাশিত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, ইলিয়াসের দায়িত্বাধীন এলাকায় উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে একটি কথিত সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। সেখানে অভিযোগ করা হয়, কোনো কোনো ভবনে নোটিশ দেওয়া, পুনরায় নোটিশ দেওয়া, উচ্ছেদ প্রস্তাব পাস করা এবং পরে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার মধ্যে আর্থিক লেনদেনের সুযোগ তৈরি করা হতো।
প্রতিবেদনটিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, নকশায় অনুমোদিত তলার চেয়ে বেশি তলা নির্মাণ, আবাসিক ভবন বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার, নকশা পরিবর্তন এবং ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রাখার মতো বিষয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের অভিযানেই নতুন মাত্রা
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ নকশা অনুমোদন, নির্মাণ তদারকি ও পরিদর্শন কার্যক্রমে অনিয়ম, ঘুষ-দুর্নীতি এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে রাজউকে দুদকের অভিযান হয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইলিয়াসকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো আর শুধু কোনো একটি ভবন বা একটি মোবাইল কোর্টের ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং রাজউকের মাঠপর্যায়ে নোটিশ থেকে অভিযান, অভিযান থেকে উচ্ছেদ, মিটার জব্দ থেকে পুনঃসংযোগ এবং নকশা অনুমোদন থেকে নির্মাণ তদারকি—পুরো প্রক্রিয়াটি কতটা জবাবদিহিমূলকভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বক্তব্যে এক কথা, মাঠে আরেক চিত্র
মালাকারটোলা প্রসঙ্গে ইলিয়াসের বক্তব্য হলো, ভবনটিতে আগে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়েছে এবং আবার বিধিবহির্ভূত নির্মাণ হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিন্তু মাঠপর্যায়ের অভিযোগ বলছে, অভিযানের পরও নির্মাণকাজ চলেছে। ফলে এখানে ব্যক্তিগত অভিযোগের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সরকারি নথির সঙ্গে মাঠের বাস্তবতার মিল।
রাজউকের কাছে থাকা মোবাইল কোর্টের আদেশ, পরিদর্শন প্রতিবেদন, ছবি ও ভিডিও, মিটার জব্দের কাগজপত্র, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের চিঠি, ভবন মালিককে দেওয়া নোটিশ, পরবর্তী পরিদর্শনের প্রতিবেদন এবং পুনরায় নির্মাণ বন্ধে নেওয়া ব্যবস্থা-এসব নথি পর্যালোচনা করলেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
রাজউকের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্তের দায়িত্বও প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ব্যবস্থার পাশাপাশি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংস্থার হাতে দেওয়া হলে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগ বাড়ে।
মালাকারটোলার একটি ভবন থেকে শুরু হওয়া এই প্রশ্ন এখন বৃহত্তর-রাজউকের অভিযান কি শুধু মিটার জব্দ ও নোটিশেই সীমাবদ্ধ, নাকি অভিযানের পরও অবৈধ নির্মাণ বন্ধ থাকে? আর যদি বন্ধ না থাকে, তাহলে দায়টা কোথায়?