গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লিফটে আটকে রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করেছিল তদন্ত কমিটি। আর রাজধানীর আজিমপুর সরকারি কলোনিতে ৬৪ কোটি টাকার স্বয়ংক্রিয় কার-পার্কিং ভবন নির্মাণ প্রকল্পের কাজ দুই বছরের বেশি সময় আগে শেষ হয়। কিন্তু চারটি দরজা দিয়ে পানি ঢোকায় এখনো কার-পার্কিং শুরু করা যায়নি। অথচ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে আগেই বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
আলোচিত এই দুই প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রওশন এলিভেটরস। একের পর এক অনিয়ম ও ব্যর্থতার অভিযোগ উঠলেও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পে তারা নিয়মিত কাজ পেয়ে যাচ্ছে। তবে এই বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব বলেছেন, এ ব্যাপারে বিস্তারিত জেনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১২ মে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগ থেকে সিসিইউতে নেওয়ার সময় মনতাজ বেগম (৫০) নামে এক রোগী লিফটে আটকা পড়েন। প্রায় ৪৫ মিনিট আটকে থাকার পর তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হলে মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেনের স্বাক্ষরিত একটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে রওশন এলিভেটরসের লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করা হয়। একইসঙ্গে লিফট স্থাপনের কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম-১০ বিভাগের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল হালিম, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী, উপসহকারী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। বর্তমানে আব্দুল হালিম খুলনা গণপূর্ত ই/এম বিভাগে কর্মরত রয়েছেন।
মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের তদন্ত প্রতিবেদনে এতো কঠোর সুপারিশ থাকার পরও রওশন এলিভেটরসের কার্যক্রমে দৃশ্যমান কোনো প্রভাব পড়েনি। বরং প্রতিষ্ঠানটি আগের মতোই বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে কাজ করে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, লিফট বিক্রয়ের সময় যেসব শর্ত দেওয়া হয় সেগুলো কোম্পানির পক্ষে থাকে, গ্রাহক বা ক্রেতার পক্ষে থাকে না। আর এসব সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রকৌশলীদের যোগসাজশে সম্ভব হয়।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের আরেকটি প্রকল্প আজিমপুর সরকারি কলোনির ১৩ তলাবিশিষ্ট স্বয়ংক্রিয় কার-পার্কিং ভবন প্রকল্পের কাজে সমস্যা থাকার বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা ও জবাবদিহি নিয়ে। ৭ হাজার ২০০ বর্গফুট আয়তনের এ স্থাপনায় ২৪০টি গাড়ি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। কোরিয়ার প্রতিষ্ঠান স্যামজাং টেক লিমিটেডের সরঞ্জাম ব্যবহার করে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় রওশন এলিভেটরস লিমিটেড।
গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, তিন বছরেরও বেশি সময় আগে নির্মাণকাজ শেষ হলেও এখনো চালু করা যায়নি স্বয়ংক্রিয় কার-পার্কিং। অথচ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এরই মধ্যে বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পার্কিং ভবনে ঢোকার চারটি দরজা দিয়ে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করায় স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রায় ৬৪ কোটি টাকার প্রকল্পটি প্রায় ২ বছর ধরে অচল অবস্থায় আছে। এভাবে পড়ে থাকলে অত্যাধুনিক ও দামি যন্ত্রপাতি পুনরায় মেরামত বা ক্রয় করার প্রয়োজন হতে পারে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্পটির দায়িত্বে ছিলেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম-৩ বিভাগের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ মো. তানভীর আলম। বর্তমানে তিনি ই/এম-৪ সচিবালয়ে কর্মরত। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শেড না থাকায় দরজা দিয়ে পানি প্রবেশ করে। আমি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বিষয়টি দেখিয়ে দিয়েছি। এখন কিছু হলে তার দায়-দায়িত্ব আমার নয়।’
রওশন এলিভেটরসের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্কের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে এই প্রকৌশলী বলেন, ‘শুধু আমার ডিভিশনেই রওশন এলিভেটরস কাজ পেয়েছে এমন নয়। অন্য ডিভিশনেও তারা কাজ করছে।’
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ই/এম-৩ এর বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম মঈনুল হকের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি। পরে তার ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে প্রশ্ন লিখে পাঠানো হলেও এই প্রতিবেদন লেখার আগ পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
আজিমপুরের স্বয়ংক্রিয় কার-পার্কিং ভবন নির্মাণ প্রকল্পের অগ্রগতি ও অভিযোগের বিষয়ে রওশন এলিভেটরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবু ফায়েজের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি। কোনো কিছু জানার থাকলে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলুন। আমি কিছু বলব না।’ এসব কথা বলার পর তিনি কল কেটে দেন।
পুনরায় রওশন এলিভেটরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে কল দিয়ে শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লিফট দুর্ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বেশ উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘আমাকে কল দিয়ে বিরক্ত করবেন না।’
হাসপাতালে লিফট দুর্ঘটনার বিষয়ে জানতে পক্ষ থেকে তৎকালীন ই/এম-১০ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল হালিমের মুঠোফোনে কল করা হলে প্রথম তিনি দায়িত্বে থাকার বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করেন। পরে বলেন, ‘আমি ২০২৩ সালে সেখান থেকে চলে এসেছি।’
তদন্ত প্রতিবেদনে বিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশের বিষয়ে জানতে চাইলে এই প্রকৌশলী বলেন, ‘হাসপাতালে ওই লিফট লাগানো হয়েছিল ২০১৪ সালে। সব বিভাগেই তদন্ত করা হয়েছে। এর সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।’ এরপর কোনো মন্তব্য না করেই তিনি কল কেটে দেন।
এ বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি মুঠোফোনে বলেন, ‘ঘটনাগুলো আমার যোগদানের আগের। তাই রওশন এলিভেটরস সম্পর্কে এখনই কোনো মন্তব্য করতে পারছি না। আর গাজীপুর হাসপাতালের লিফট দুর্ঘটনায় জড়িত প্রকৌশলীদের বিষয়েও খোঁজ নিতে হবে। দুটি বিষয়ে যদি হোয়াটসঅ্যাপে লিখে পাঠান তাহলে যাচাই করে ব্যবস্থা নিতে সহজ হবে।’
সার্বিক বিষয়ে জানার জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর মুঠোফোনে পক্ষ থেকে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি। পরে তার ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বিস্তারিত লিখে পাঠালেও তিনি এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো সাড়া দেননি।