মাফিয়া শাসক শেখ হাসিনা আজীবন ক্ষমতায় থাকার জন্য বিরোধীদের দমন ও ধ্বংস করতে সর্বাত্মক নীতি গ্রহণ করেছিলেন। এ লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি দলীয় বাহিনী লেলিয়ে দিয়েছিলেন। এমনকি দলীয় সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল রাষ্ট্রীয় অস্ত্র। দেড় যুগ ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিরোধী দল ও মতের লোকজনকে গুম, খুন, অপহরণ, নির্যাতন, হামলা, মামলার এক কালো অধ্যায় রচনা করে। অন্যদিকে ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সমর্থন নিয়ে রাজধানীসহ সারা দেশে তৃণমূলপর্যায় পর্যন্ত ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। জীবন রক্ষায় বিরোধী দলের অনেক নেতাকর্মী এলাকা ছাড়া, অনেকে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন জনপদ বিশেষভাবে পরিচিতি পায় সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে। এ ধরনের একটি এলাকা ছিল কুষ্টিয়া। অন্য যেকোনো জেলার চেয়ে কুষ্টিয়ার আওয়ামী নেতাকর্মীরা ছিলেন অনেক বেশি বেপরোয়া।
আমার দেশ-এর তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে সারা দেশে ১৩০টি মামলা করা হয়েছিল। এর মধ্যে একটি ছিল কুষ্টিয়া ছাত্রলীগের করা মামলা। ২০১৭ সালের ১ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে একটি সেমিনারে বক্তব্য দেওয়ার পর কুষ্টিয়ায় মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ হাসিনা ও শেখ হাসিনার ভাগনি টিউলিপ সিদ্দিককে নিয়ে কথিত অবমাননাকর বক্তব্যের অভিযোগে মানহানি মামলা করা হয়। ওই মামলায় জামিন নিতে মাহমুদুর রহমান ২০১৮ সালের ২২ জুলাই কুষ্টিয়ার আদালতে হাজির হন। আদালত জামিন মঞ্জুর করেন। সেদিন স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা মাহমুদুর রহমানের ওপর হামলার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছিল। দুপুর থেকেই আদালত প্রাঙ্গণে আগ্নেয়াস্ত্র, লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে অবস্থান নেয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের শতাধিক সন্ত্রাসী। জামিন পাওয়ার পর তারা মাহমুদুর রহমানকে কুষ্টিয়া সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের একটি কক্ষে অবরুদ্ধ করে রাখে। এ অবস্থায় বিকেল গড়িয়ে যায়। একপর্যায়ে মাহমুদুর রহমান আদালতকক্ষ থেকে বের হয়ে নিজের গাড়িতে ওঠার চেষ্টা করলে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা লাঠিসোঁটা এবং ইটপাথর নিয়ে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আদালত চত্বরে তাদের নৃশংস হামলায় মাহমুদুর রহমানের সারা শরীর রক্তে ভিজে যায় সেদিন। হামলাকারীরা এ সময় তার গাড়িটি ভাঙচুর করে। এই হামলার সময় তখনকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শুধু নীরব ভূমিকা পালন করেনি, কুষ্টিয়ার তৎকালীন বিতর্কিত এসপি মেহেদী হাসান পেছন থেকে এই হামলার সব আয়োজন করেছিলেন ।
চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে মাফিয়া শাসক শেখ হাসিনার বিদায় হয়েছে, কিন্তু কুষ্টিয়াসহ দেশের নানা স্থানে ফ্যাসিবাদী আমলের মতো বিরোধীদের ওপর হামলার চরিত্র বদলায়নি। এই কুষ্টিয়াতেই গত ৪ অক্টোবর লালন শাহর মাজারে হামলার শিকার হয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ব্যক্তিগত কাজে পাটওয়ারী গিয়েছিলেন কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায়। সেখান থেকে ঢাকায় ফেরার পথে তিনি লালন শাহর মাজার পরিদর্শনে যান। এটি কোনো রাজনৈতিক বা দলীয় কর্মসূচি ছিল না এবং তিনি সেখানে কোনো বক্তব্যও দেননি। কিন্তু এরপরও পরিদর্শন শেষে মাজার প্রাঙ্গণে তার ওপর হামলা চালায় ক্ষমতাসীন দলের উচ্ছৃঙ্খল একদল নেতাকর্মী। ভাঙচুর করা হয় তার গাড়ি। এনসিপির পক্ষ থেকে এ হামলার জন্য স্থানীয় বিএনপি ও তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলকে দায়ী করা হয়েছে। এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘দেশে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকে এটি নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর পঞ্চমবারের মতো হামলা।
কুষ্টিয়ায় আরেকটি ঘটনা সম্প্রতি দেশজুড়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। জেলার দৌলতপুরে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে সঠিক উচ্চারণ হয়নি বলে সমালোচনার অভিযোগে পুলিশ আটক করে। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। আটক হওয়া এই ব্যক্তি বাংলার একজন সহকারী শিক্ষক। দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলার ক্লাস নেওয়ার সময় তিনি জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া বক্তব্যের সময় বাংলা উচ্চারণগত কিছু সমস্যার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ক্লাস শেষে বাড়ি ফিরে কিছু শিক্ষার্থী এ ঘটনা তাদের অভিভাবকদের জানান। এ ঘটনাকে অনেক অতি উৎসাহী অভিভাবক প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কটূক্তি করা হয়েছে বলে দাবি করেন। পরের দিন বিএনপির নেতাকর্মীরা স্কুল প্রাঙ্গণে জড়ো হন এবং ওই শিক্ষকের শাস্তি দাবিতে বিক্ষোভ করতে থাকেন। পরিস্থিতির একপর্যায়ে পুলিশ ওই শিক্ষককে আটক করে। অবশ্য পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উদ্ভূত বিরূপ পরিস্থিতি থেকে রক্ষায় তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ গণমাধ্যমের কল্যাণে এ ঘটনা মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে অবিলম্বে আটক শিক্ষককে মুক্তি দিয়ে সম্মানের সঙ্গে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং প্রধানমন্ত্রীর এ ত্বরিত পদক্ষেপ দেশজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে।
কুষ্টিয়ায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলা কিংবা শিক্ষককে ধরে পুলিশে দেওয়ার এসব ঘটনার মূলে রয়েছে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা। আওয়ামী আমলে কুষ্টিয়ায় আদালত প্রাঙ্গণে মাহমুদুর রহমানের ওপর হামলার মাধ্যমে আওয়ামী নেতাকর্মীরা জানিয়ে দিয়েছেন, বিচার ও আদালত নয়, পেশিশক্তির মাধ্যমে তারা ভিন্নমত দমন করবেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে কুষ্টিয়ায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে আমরা একই ধরনের মানসিকতা দেখছি।
এর আগে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর যারা হামলা করেছে, তাদের কারো বিচার হয়নি। হবিগঞ্জে হামলার বিচার হলে কুষ্টিয়ায় হামলা হতো না। এর মাধ্যমে মূলত পাটওয়ারীর ওপর হামলাকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্য নিয়ে যে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে। তার আক্রমণাত্মক বক্তব্যের সমালোচনা হতে পারে। কিন্তু একজনের কথা ভালো লাগছে না বলে তার ওপর হামলা করা কোনো রাজনৈতিক আচরণ হতে পারে না। তার ওপর হামলার কারণে বরং তিনি সবসময় আলোচনায় থাকছেন, এমনকি অনেকে সহানুভূতি পাচ্ছেন। পাটওয়ারীর কথা পছন্দ হচ্ছে না বলে তার ওপর হামলা করা বৈধ হতে পারে না। অন্তত চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর হামলার মাধ্যমে বিরোধী মত দমনের সংস্কৃতি মেনে নেওয়া যায় না। দেশের মানুষ আশা করেছিল, রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী নোংরা রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান ঘটবে। কিন্তু তা তো হচ্ছে না, বরং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা যেন আওয়ামী পান্ডাদের অনুসরণ করতে চাইছে। পুলিশের চরিত্রের বদল হবে বলে যে আশা করা হয়েছিলো তাও হয়নি। পুলিশ যেনো আগের মতো দলীয় বাহিনীর ভুমিকায় অবতীর্ন হতে চাইছে।
দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর প্রশাসনসহ সর্বস্তরে যেভাবে আওয়ামী ফ্যাসিবাদবিরোধী শুদ্ধি অভিযানের প্রয়োজন ছিল, তা হয়নি। শেখ হাসিনা দেশের সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দলীয় বাহিনীতে পরিণত করে তাদের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। একইভাবে প্রশাসন, বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ওপরও তার চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এভাবে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে তিনি ব্যবহার করেছিলেন বিরোধী দল, মত দমন ও ধ্বংস করার জন্য এবং রাষ্ট্রের ওপর স্থায়ীভাবে একচ্ছত্র পারিবারিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দখল, লুটপাট, ভাগবাটোয়ারার মাধ্যমে সরাসরি উপকারভোগী ও অন্ধভক্ত দলীয় একটি শ্রেণি ছাড়া পুরো দেশবাসী শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে গণবিস্ফোরণের অপেক্ষায় ছিল। চব্বিশের জুলাই বিপ্লব ছিল সেই দীর্ঘ গণআকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন। দেশের গণমানুষকে বিরুদ্ধে ঠেলে দিয়ে রাষ্ট্রের সব বাহিনী, প্রশাসন ও বিচার বিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ সব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং দলীয় বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েও শেখ হাসিনার শেষ রক্ষা হয়নি। সুতরাং দল ও অঙ্গসংগঠন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসনসহ সব ক্ষেত্রেই অতিউৎসাহীদের থেকে সাবধান হতে হবে। বিশেষ করে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আগের ফ্যাসিবাদী সরকারের লাঠিয়াল বাহিনী থেকে পেশাদার বাহিনীতে পরিণত করতে না পারলে বর্তমান সরকারের জন্যও তারা বিপর্যয়ের কারণ হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।