নিজস্ব প্রতিবেদক: মোঃ ইউনুস হোসেন রনি
সরকারি চাকরিতে নিয়োগের স্বপ্ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নেন লাখো তরুণ-তরুণী। কিন্তু নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠলে সেই স্বপ্ন, মেধা ও পরিশ্রমের মূল্য নিয়ে তৈরি হয় গভীর অনিশ্চয়তা। এমন পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালের ১০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। পরীক্ষার্থীদের দাবি, পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রশ্ন ফাঁসের খবর ছড়িয়ে পড়ায় শেষ মুহূর্তে পরীক্ষা বাতিলের কথা জানিয়ে তাঁদের কেন্দ্র থেকে চলে যেতে বলা হয়।
পরীক্ষার্থীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৯৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একযোগে এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এতে প্রায় ৩ লাখ ১৯ হাজার ২৭৬ জন প্রার্থীর অংশ নেওয়ার কথা ছিল। পরীক্ষায় অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চাকরিপ্রত্যাশীরা ঢাকাসহ বিভিন্ন পরীক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিত হন। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী, পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল সকাল ১১টায়।
পরীক্ষাকেন্দ্রে গিয়ে ফিরে আসার অভিযোগ
পরীক্ষার্থীদের বর্ণনা অনুযায়ী, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শিক্ষক-শিক্ষিকারা শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন এবং পরীক্ষার্থীদের ওএমআর ফরম দেওয়া হয়। পরীক্ষার্থীরা ফরম পূরণ করার পর সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটের দিকে তাঁদের পরীক্ষা না দিয়েই কেন্দ্র ছেড়ে যেতে বলা হয়।
পরীক্ষার্থীদের দাবি, এ সময় তাঁদের জানানো হয়, সকাল ৮টার দিকে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার খবর পাওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা, পরীক্ষা বাতিলের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
২০ থেকে ২৫ লাখ টাকায় প্রশ্ন বিক্রির অভিযোগ
পরীক্ষার্থীদের কয়েকজনের অভিযোগ, এ নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র অর্থের বিনিময়ে বিক্রির একটি চক্র সক্রিয় থাকতে পারে। তাঁদের দাবি, একটি অসাধু চক্র সরকারি উচ্চপর্যায়ের কিছু ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতায় বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন বিক্রি করেছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ, লেনদেনের তথ্য কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
মেধাবীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ
পরীক্ষার্থীরা বলেন, চাকরির জন্য দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি, আর্থিক ব্যয় ও পারিবারিক প্রত্যাশা নিয়ে তাঁরা পরীক্ষায় অংশ নিতে এসেছিলেন। কিন্তু পরীক্ষার দিন এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ায় তাঁরা হতাশ ও উদ্বিগ্ন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে অন্যায় নয়, বরং সরকারি নিয়োগব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার জন্যও গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
অভিভাবকদের দাবি, প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করতে হবে। অভিযোগের সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত থাকলে তাঁদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিতরণব্যবস্থা আরও নিরাপদ করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও তদন্তের দাবি
পরীক্ষা বাতিলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা, প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের সত্যতা এবং এ ঘটনায় কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগের উৎস শনাক্ত, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সম্ভাব্য পথ অনুসন্ধান এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
চাকরিপ্রত্যাশীদের প্রত্যাশা, নিয়োগ পরীক্ষা যেন কোনো ব্যক্তি বা চক্রের আর্থিক স্বার্থের কাছে জিম্মি না হয়। মেধা, যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের বিকল্প নেই।