সার্বিয়ায় ৫০০ কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় বড় জালিয়াতি, নেপথ্যে রোম দূতাবাস!

আপলোড সময় : ১৯-১০-২০২৬ ১০:২৪:৫৬ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ১৯-১০-২০২৬ ১০:২৪:৫৬ পূর্বাহ্ন
দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশ সার্বিয়ায় ৫০০ সাধারণ কর্মী (জেনারেল ওয়ার্কার) পাঠানোর একটি প্রক্রিয়া ঘিরে বড় ধরনের নথি জালিয়াতি ও আর্থিক প্রতারণার প্রমাণ মিলেছে। সার্বিয়ার একটি অতিক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের নামে তৈরি করা চাহিদাপত্রে স্পষ্ট জালিয়াতি এবং আদালতের সিলের তারিখে দুই বছরের গরমিল থাকার পরও কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই তাতে সরকারি সত্যায়ন (অ্যাটেস্টেশন) দিয়েছে ইতালির রোমে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সার্বিয়ার যে প্রতিষ্ঠানটি ৫০০ কর্মী নেওয়ার চাহিদাপত্র পাঠিয়েছে, তাদের সারা বছরের পরিচালন আয়ের অঙ্ক দিয়ে কর্মীদের এক দিনের বেতন দেওয়াও সম্ভব নয়। অন্যদিকে ঢাকায় দূতাবাস সত্যায়িত চাহিদাপত্র দেখিয়ে কর্মীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার তোড়জোড় চললেও কর্মীদের ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে ভিন্ন শর্ত ও কম বেতনের চুক্তিপত্র। এমনকি চাহিদাপত্র ও আমমোক্তারনামা (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) যে রিক্রুটিং এজেন্সির নামে এসেছিল, তাদের বাদ দিয়ে অন্য একটি এজেন্সি জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) থেকে কর্মী পাঠানোর সরকারি অনুমোদনও বের করে নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অস্তিত্বহীন ও কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে কর্মী পাঠানোর এই প্রক্রিয়া মূলত বলকান রুট দিয়ে ইউরোপে মানবপাচারের একটি বড় ফাঁদ। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করে সার্বিয়ায় যাওয়া শত শত কর্মী চরম বিপদে পড়বেন। আবাসিক ফ্ল্যাটে অফিস, বাৎসরিক আয়ে এক দিনের বেতনও অসম্ভব নথিপত্র অনুযায়ী, সার্বিয়ার ভোজভোদিনা অঞ্চলের সোমবোর (Sombor) শহরের ‘ইন্টারস্টাফ সার্ভিস ডিওও সোমবোর’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৫০০ কর্মীর চাহিদাপত্র তৈরি করা হয়েছে। সার্বিয়ার করপোরেট ও অর্থনৈতিক তথ্যভান্ডার (কোম্পানিওয়াল বিজনেস সার্বিয়া) পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এটি মূলত একটি অতিক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান (মাইক্রো-এন্টারপ্রাইজ)। সরকারি নথিতে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় দেখানো হয়েছে সোমবোরের ‘প্রোতে মাতেয়ে নেনাদোভিচা ২৪’ ভবনের ৫ নম্বর আবাসিক ফ্ল্যাটে। প্রতিষ্ঠানটি ‘অস্থায়ী কর্মসংস্থান সংস্থা’ (কোড: ৭৮.২০) হিসেবে নিবন্ধিত। এর অর্থ হলো, তাদের নিজস্ব কোনো কারখানা বা শিল্প প্রকল্প নেই, এরা মূলত বাইরে থেকে শ্রমিক এনে স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দিনমজুর বা সাব-কন্ট্রাক্টে ভাড়া দেয়। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী ঘেঁটে দেখা যায়, পুরো বছরে তাদের মোট পরিচালন আয় ছিল মাত্র ৯ লাখ ৪৫ হাজার সার্বিয়ান দিনার (আরএসডি), যা বাংলাদেশি মুদ্রায় পৌনে ৯ লাখ টাকার সমপরিমাণ (প্রায় ৮ হাজার ৭০০ মার্কিন ডলার)। অথচ কর্মীদের চাহিদাপত্রে প্রতি মাসে মূল বেতন ধরা হয়েছে ৭৫ হাজার দিনার। ৫০০ কর্মীকে এই বেতন দিতে গেলে প্রতি মাসে প্রয়োজন পড়বে ৩ কোটি ৭৫ লাখ দিনার। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির সারা বছরের যে মোট আয়, তা দিয়ে ৫০০ কর্মীর এক দিনের বেতন দেওয়াও সম্ভব নয়। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কর্মীদের বিনা খরচে আবাসন, খাবার, উড়োজাহাজের টিকিট ও চিকিৎসা বিমা দেওয়ার অঙ্গীকার পুরোটাই কাগুজে প্রতারণা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ২০২৪ সালের নোটারি সিলে ২০২৬ সালের তথ্য প্রত্যয়ন! নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রধান আইনি দলিল হলো সার্বিয়ান ভাষায় করা আমমোক্তারনামা (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি)। এই নথিতে পাওয়া গেছে জালিয়াতির সুস্পষ্ট প্রমাণ। অনূদিত দলিলের ৩ নম্বর পৃষ্ঠায় দেখা যায়, সার্বিয়ার নোভি সাদ মৌলিক আদালতের পাবলিক নোটারির কার্যালয়ের সই ও সিলমোহর রয়েছে ১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখের। অথচ সেই একই নোটারি প্রত্যয়নে বলা হয়েছে, কোম্পানিটির তথ্য যাচাই করা হয়েছে সার্বিয়ার বিজনেস রেজিস্ট্রি এজেন্সির (এপিআর) ৭ জুন ২০২৬ তারিখের তথ্য অনুযায়ী। আবার সার্বিয়ান ভাষায় মূল আমমোক্তারনামার তারিখ দেখানো হয়েছে ১৫ মে ২০২৬ এবং এর ইংরেজি অনুবাদের প্রত্যয়ন দেওয়া হয়েছে ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে। আইনবিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোনো আদালত বা নোটারি কীভাবে দুই বছর পরের (২০২৬ সালের জুন) তথ্য প্রত্যয়ন করতে পারে? নথিপত্র বিশ্লেষণ করে বোঝা যায়, অতীতের কোনো পুরোনো দলিলের নোটারি সিল ও স্বাক্ষরের পাতা স্ক্যান করে জালিয়াতির মাধ্যমে এই দলিলের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মূল চাহিদাপত্রে তারিখ দেওয়া রয়েছে ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, অথচ আমমোক্তারনামায় চাহিদাপত্রের তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ১৫ মে ২০২৬। ফলে আইনিভাবে এই আমমোক্তারনামা দিয়ে সেপ্টেম্বর মাসের চাহিদাপত্র কার্যকর করার কোনো সুযোগ নেই। কোনো যাচাই ছাড়াই রোম দূতাবাসের সিলমোহর সার্বিয়ায় বাংলাদেশের কোনো আবাসিক মিশন নেই। ফলে ইতালির রোমে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসই সার্বিয়ার কূটনৈতিক ও শ্রমের বিষয়গুলো অনাবাসিক হিসেবে দেখভাল করে। নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর রোম দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম ও কল্যাণ) আসিফ এনাম সিদ্দিকী কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই এই বিতর্কিত চাহিদাপত্র ও আমমোক্তারনামায় সত্যায়ন (রেফারেন্স: Rec. RM. Ser 2026/20(1) ও 20(2)) দেন। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুযায়ী, ইউরোপের কোনো অচেনা বা ঝুঁকিপূর্ণ দেশে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক কর্মীর চাহিদাপত্র এলে সংশ্লিষ্ট শ্রম কর্মকর্তার দায়িত্ব হলো প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতা, কর পরিশোধের তথ্য এবং কাজের পরিবেশ সরেজমিন বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা। কিন্তু রোম দূতাবাস কোনো তদন্ত ছাড়াই এই নথিতে সিলমোহর দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং সিন্ডিকেটের সুবিধা নিশ্চিত করতেই তড়িঘড়ি করে এই সত্যায়ন দেওয়া হয়েছে। চাহিদাপত্র এক এজেন্সির, ছাড়পত্র অন্যের চাহিদাপত্র ও আমমোক্তারনামা অনুযায়ী, সার্বিয়ার প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে তাদের আইনি প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছিল মেসার্স মোহাম্মদী ট্রেড ইন্টারন্যাশনালকে (লাইসেন্স নং: RL-919)। অথচ এই একই চাহিদাপত্র ব্যবহার করে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) থেকে ১৫ জন কর্মীর নিয়োগানুমতি বের করে নিয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি প্রতিষ্ঠান—মেসার্স এইচ.পি ওভারসীজ লিমিটেড (লাইসেন্স নং: RL-1388; ব্যবস্থাপনা পরিচালক: প্রবীর বণিক)। বিএমইটির তথ্যে দেখা যায়, ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর এইচ.পি ওভারসীজের অনুকূলে এই ১৫ জনের নিয়োগানুমতি (অনুমোদন নম্বর: RS-RL1388-2026-615276) দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এক এজেন্সির চাহিদাপত্র অন্য এজেন্সির কাছে বিক্রি করে কর্মী পাঠানোর যে অবৈধ চক্র সক্রিয়, এটি তারই অংশ। চুক্তিপত্রে মাসে ১৮ হাজার টাকা গায়েব রোম দূতাবাস যে চাহিদাপত্র সত্যায়ন করেছে, তার সঙ্গে কর্মীদের ধরিয়ে দেওয়া ব্যক্তিগত নিয়োগপত্র (জব অফার লেটার) ও সার্বিয়ান ভাষার মূল শ্রমচুক্তির (উগোভর ও রাদু) শর্তে বড় ধরনের গরমিল রয়েছে। দূতাবাস সত্যায়িত চাহিদাপত্রে কর্মীদের জন্য সপ্তাহে দুই দিন ছুটি এবং মাসিক মূল বেতন ৭৫ হাজার সার্বিয়ান দিনার উল্লেখ ছিল। কিন্তু কর্মীদের হাতে যে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে, তাতে সপ্তাহে মাত্র এক দিন ছুটি এবং মাসিক বেতন কমিয়ে ৬০ হাজার দিনার করা হয়েছে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে উচ্চ বেতন ও দুই দিন ছুটির কথা বলে দূতাবাস থেকে সরকারি অনুমোদন নেওয়া হলেও বাস্তবে বাংলাদেশ থেকেই কর্মীদের কম বেতনের চুক্তিতে সই করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে প্রতি কর্মীর বেতন থেকে প্রতি মাসে ১৫ হাজার দিনার বা প্রায় ১৮ হাজার টাকা করে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। বলকান রুটে মানবপাচারের শঙ্কা আন্তর্জাতিক অভিবাসন নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সার্বিয়া, বসনিয়া ও ক্রোয়েশিয়া হয়ে বলকান রুট দিয়ে ইতালি ও ইউরোপের দেশগুলোতে প্রবেশের জন্য মানবপাচারকারী চক্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠানের আড়ালে ৫০০ সাধারণ কর্মী নেওয়ার এই প্রক্রিয়া মূলত মানবপাচারেরই বড় ফাঁদ। কর্মীরা সার্বিয়ায় পৌঁছানোর পর কাজ না পেয়ে দালালের খপ্পরে পড়ে সীমান্ত পাড়ি দিতে গিয়ে আটক কিংবা অমানবিক বন্দিদশায় পড়তে পারেন। নথিপত্রে এমন গুরুতর অসংগতি থাকার পরও কেন সত্যায়ন দেওয়া হলো, তা জানতে রোম দূতাবাসের প্রথম সচিব আসিফ এনাম সিদ্দিকীর দাপ্তরিক ই-মেইল ও অফিশিয়াল টেলিফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো সাড়া মেলেনি। এইচ.পি ওভারসীজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রবীর বণিকের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনিও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরুর (RMMRU) এক জ্যেষ্ঠ ফেলো *দৈনিক আমাদের দিন*কে বলেন, একটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা না থাকা এবং নোটারির তারিখে দুই বছরের গরমিল থাকার পরও দূতাবাস কীভাবে তাতে সিল মারল, তা বোধগম্য নয়। অবিলম্বে রোম দূতাবাসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত হওয়া দরকার এবং এই চাহিদাপত্রের অধীনে সব ধরনের ছাড়পত্র বাতিল করা উচিত। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে *দৈনিক আমাদের দিন*কে বলেন, দূতাবাস সত্যায়িত নথিতে জালিয়াতির প্রমাণ থাকলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। রোম মিশন ও বিএমইটির সঙ্গে কথা বলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সম্পাদকীয় :

উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য : ডাঃ মোঃ হাফিজুর রহমান
সম্পাদক : তোফাজল আহমেদ ফারুকী
ব্যাবস্থাপনা সম্পাধক : আব্দুল্লাহ রানা সোহেল
প্রকাশক : মোঃ সোহেল রানা
বার্তা সম্পাদক : মোঃ আব্দুল কাদের জিলানী
প্রধান প্রতিবেদক : হাসিবুর রহমান হাসিব 

যোগাযোগের ঠিকানা :

লাবিনা এপার্টমেন্টে # বাড়ি এ-৩, রোড # ০৮, সেক্টর #০৩,উত্তরা
উত্তরা মডেল টাউন -ঢাকা -১২৩০, বাংলাদেশ

মোবাইল :  ০১৭১৭-৬৭৬৬৬৪

ই-মেইল :  dailyvoicenews247@gmail.com