মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি ও তদারকি ছাড়াই একক সিদ্ধান্তে সার্বিয়ার একটি দেউলিয়া ও নামসর্বস্ব পেপার কোম্পানিতে কর্মী পাঠানোর ক্লিয়ারেন্স দিচ্ছে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ক্লিয়ারেন্স শাখা। রিক্রুটিং এজেন্সি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অনৈতিক আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে এই অনিয়ম করা হচ্ছে বলে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন।
অভিবাসন খাতের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, সার্বিয়ার মতো সংবেদনশীল বা নতুন কোনো দেশে কর্মী পাঠানোর আগে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের যাচাইবাছাই এবং আনুষ্ঠানিক পূর্বানুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। পূর্ব ইউরোপের এসব দেশ ব্যবহার করে অনেকেই অবৈধভাবে পশ্চিম ইউরোপের শেনজেনভুক্ত দেশে প্রবেশের চেষ্টা করায় মন্ত্রণালয় বরাবরই এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেয়।
তবে অভিযোগ উঠেছে, বিএমইটির ক্লিয়ারেন্স শাখা সরকারের মূল তদারকি সংস্থাকে কোনো তোয়াক্কা না করেই নিজস্ব ক্ষমতায় ‘লজিক্কা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সলিউশনস ডিওও’ (Logikka Artificial Intelligence Solutions d.o.o.) নামের একটি বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানের ফাইল অনুমোদন করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মন্ত্রণালয়কে পাশ কাটিয়ে এমন ছাড়পত্র দেওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন এবং এটি অভিবাসন আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
সম্প্রতি ওই কোম্পানিটির ওপর প্রকাশিত একটি ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রতারক চক্রটি সাধারণ চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছে এটিকে নামীদামি তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি বা এআই) প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন করে আকর্ষণীয় বেতনের প্রলোভন দেখাচ্ছে। অথচ সার্বিয়ার সরকারি দপ্তরে প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধিত কাজের ধরন হলো ‘অন্যান্য বিশেষায়িত নির্মাণকাজ’ (কোড: ৪৩৯৯)।
নথিপত্র অনুযায়ী, কোম্পানিটির বার্ষিক মোট আয় মাত্র ২১ লাখ ৪৬ হাজার সার্বিয়ান দিনার (প্রায় ১৯ থেকে ২০ হাজার মার্কিন ডলার)। এই সামান্য আয় দিয়ে একজন কর্মীর বার্ষিক সর্বনিম্ন বেতন ও পরিচালনা ব্যয় মেটানোও অসম্ভব। ফলে বিদেশ থেকে কর্মী এনে তাঁদের বেতন দেওয়ার মতো কোনো অর্থনৈতিক সক্ষমতা প্রতিষ্ঠানটির নেই। এটি সাভো ক্লিকোভাক নামের এক ব্যক্তির মালিকানাধীন একটি অতি ক্ষুদ্র পেপার কোম্পানি মাত্র।
বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন, ২০১৩-এর ৩১ ধারা অনুযায়ী, মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে অর্থ গ্রহণ এবং অবৈধভাবে বিদেশে কর্মী প্রেরণ একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অথচ বিএমইটির ভেতরের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এসব জালিয়াতি জেনেও নিজেদের পকেট ভারী করতে দ্রুত ছাড়পত্র দিচ্ছে।ব
দালাল চক্রগুলো আইটি খাতের স্বপ্ন দেখিয়ে নিরীহ কর্মীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, নথিপত্রে জালিয়াতি এবং মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না থাকায় সার্বিয়ার অভিবাসন আইন অনুযায়ী যেকোনো মুহূর্তে এসব কর্মীর ওয়ার্ক পারমিট ও ভিসা বাতিল হতে পারে। এর ফলে কর্মীরা অবৈধ হয়ে পড়ার পাশাপাশি পুলিশের হাতে আটক হওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন।
মন্ত্রণালয়ের নজরদারি এড়িয়ে ভুয়া কোম্পানির ফাইল ক্লিয়ার করার এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিএমইটির মহাপরিচালক (ডিজি) এবং ক্লিয়ারেন্স শাখার পরিচালক মো. তাজিম-উর-রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও কেউ ফোন ধরেননি। এমনকি খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশে গিয়ে নিঃস্ব বা আইনি জটিলতায় পড়ার আগেই যেকোনো রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে ফাইল প্রসেস করার ক্ষেত্রে তা মন্ত্রণালয় ও বিএমইটির কেন্দ্রীয় সার্ভারে বৈধভাবে অনুমোদিত কি না, তা দেশ ছাড়ার আগেই ভালোভাবে যাচাই করা উচিত।