ইমদাদুল-মিজান সিণ্ডিকেটের সার গ্রাস, নড়েচড়ে বসেছে দুদক

আপলোড সময় : ২৭-১০-২০২৬ ০২:৫৭:০৬ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৭-১০-২০২৬ ০২:৫৭:০৬ অপরাহ্ন



বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) প্রধান কাজ হলো সার উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করা। এর পাশাপাশি রাসায়নিক ও অন্যান্য শিল্পকারখানা পরিচালনার মাধ্যমে দেশের শিল্পোন্নয়নে অবদান রাখা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের একটি সিন্ডিকেট সেই সার উৎপাদন ও সরবরাহে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি করেছে।

বিসিআইসির চেয়ারম্যান শাহ মো. ইমদাদুল হক এবং ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মিজানুর রহমান বিসিআইসির অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কতিপয় কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন, কেনাকাটা ও ঠিকাদারি কাজে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিকানা অর্জন করেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এসব অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করেছে।

দুদক ও বিসিআইসি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিসিআইসির সাবেক চেয়ারম্যান শাহ মো. ইমদাদুল হক, চিটাগাং ইউরিয়া সার কোম্পানির (সিইউএফএল) ও ডিএপিএফসিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান, উপ-প্রধান প্রকৌশলী আবীদ আল হাসানসহ অন্যদের বিরুদ্ধে নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও কেনাকাটায় ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ দুদকে জমা হয় ২০২৫ সালের মার্চ মাসে। কমিশন অভিযোগটি অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়। সংস্থাটির একজন সহকারী পরিচালক অভিযোগটি অনুসন্ধান করছেন।

দুদকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিসিআইসির সাবেক চেয়ারম্যান শাহ মো. ইমদাদুল হক, সিইউএফল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান এবং ডিএপিএফসিএল-এর ব্যবস্থাপক মো. আলমগীর জলিলসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি ও সরকারি অর্থ লোপাটের অভিযোগ অনুসন্ধান চলমান রয়েছে।

দুদকের একজন কর্মকর্তা অভিযোগটি অনুসন্ধান করছেন। অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বিভিন্ন রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করাসহ অভিযুক্ত কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুসন্ধান কর্মকর্তা দ্রুত সময়ে অনুসন্ধান শেষ করে কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করবেন।

দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়েছে, সাবেক চেয়ারম্যানের দায়িত্বকালে বিসিআইসির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও পদায়নকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেন, স্বজনপ্রীতি এবং প্রভাব বিস্তারের ঘটনা ঘটেছে। একইসঙ্গে কয়েকটি সার কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ, নিয়োগ-বাণিজ্য, পদোন্নতি, পরিবহন ঠিকাদারি, ডাইরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথডে (ডিপিএম) কেনাকাটায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি করা হয়েছে। এসব দুর্নীতির সঙ্গে বিসিআইসির সাবেক ও বর্তমান একাধিক কর্মকর্তার নাম রয়েছে।

এর মধ্যে বেশি অভিযোগ বিসিআইসির চেয়ারম্যান হিসেবে শাহ মো. ইমদাদুল হকের বিরুদ্ধে। তিনি ২০২১ সালের জুনে বিসিআইসিতে যোগদান করেন। এর আগে তিনি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ছিলেন। বিসিআইসিতে যোগদানের পর তিনি সিইউএফএলসহ কয়েকটি সার কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি করেন।

এর মধ্যে এক কোটি টাকা ঘুষ নিয়ে শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানির অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে চাকরি থেকে সাসপেন্ড হওয়া মিজানুর রহমানকে ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএপিএফসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেন। এ ছাড়া ইমদাদুল হক তার নিকট আত্মীয়ের ছেলেকে বিসিআইসির প্রধান কার্যালয়ের নির্মাণ বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেন।

সিন্ডিকেটের সেকেন্ড ইন কমান্ড এমডি মিজান

বিসিআইসির চেয়ারম্যান ইমদাদুল হকের সিন্ডিকেটের সেকেন্ড ইন কমান্ড হলেন ডিএপিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মিজানুর রহমান। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে, শাহজালাল সার কারখানায় দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৭ সালে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এ ঘটনায় তিনি মামলা করেন এবং মামলায় জয়ী হন।

এরপর তিনি চেষ্টা-তদবির করে কোম্পানির পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান। শাহ মো. ইমদাদুল হক বিসিআইসির চেয়ারম্যান হওয়ার পর তাকে এক কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে মিজানুর রহমান পরিচালক থেকে ডিএপিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালক হওয়ার পর চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগসাজশ করে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।

অভিযোগে বলা হয়, মিজানুর রহমান ডিএপিএফসিএলের এমডি হওয়ার পর বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় খরচ করে এফডিআর ফান্ডের ৯৭৫ কোটি খরচ করে ফান্ড শূন্য করেন। তিনি সিইউএফএল-এ প্রতি মাসে ১৪৫ জন আনসারের স্থলে ২০০ জন আনসারের বিল উত্তোলন করেন। আনসার কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান ও হাবিলদার কমল বড়ুয়ার মাধ্যমে তিনি এ কাজ করেন।

তিনি ২০২৩ সালে সর্বনিম্ন দরদাতাকে নিয়োগ না দিয়ে সর্বোচ্চ দরদাতাকে পরিবহন ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি হিসাব ক্যাডারের কর্মকর্তা হয়েও সার কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে দায়িত্ব পেয়েছেন। এর আগে নন-টেকনিক্যাল কাউকে এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তিনি একমাত্র ঠিকাদার আইয়ুব আলীকে ছাড়া অন্য কোনো ঠিকাদারকে কাজ দেন না। তিনি আউটসোর্সিং কর্মচারীদের কাজ থেকে কমিশন নেন।

তিনি ২০২২ সালের দৈনিক হাজিরাভিত্তিক শ্রমিক মানিক নাথের স্ত্রী, বোন, ভাতিজিকে জনপ্রতি ৮ লাখ করে টাকা নিয়ে চাকরি দেন। মিজানুর রহমানের ঘোষণা হলো টাকা দেন, সুবিধা নেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন কারখানায় পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কেনাকাটা, পরিবহন ঠিকাদারি, শ্রমিক নিয়োগসহ সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

মিজানুর রহমান বর্তমানে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের (সিইউএফএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মিজানুর রহমান জানান, তিনি অভিযোগ অনুসন্ধানের বিষয়ে অবগত আছেন। দুদকের অনুসন্ধান চলমান থাকায় এ বিষয়ে তার কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না।

১১ হাজার ৫০০ টাকার ইউনিফর্ম ভাতা

দুদকে দেওয়া অভিযোগে ইউনিফর্মের অর্থ নয়ছয় করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রতিদিন শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তার জন্য বছরে ১১ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। কিন্তু বরাদ্দের ৮০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা কেটে রাখা হয়েছে। অথচ কর্মীদের কাছ থেকে ১১ হাজার ৫০০ টাকা বুঝে পাওয়ার স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। শুধু ইউনিফর্ম থেকে প্রায় ২২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মী তালিকা, বরাদ্দের অফিস আদেশ, ব্যাংক হিসাব, ভাউচার, রসিদ এবং কর্মীদের জবানবন্দি নিয়ে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে।

নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেন

চেয়ারম্যানের দায়িত্বকালে শাহ মো. ইমদাদুল হক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, বিসিআইসিতে কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন পদে একই পরিবার, একই এলাকা বা একই গ্রামের একাধিক ব্যক্তির নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে কর্মচারী মো. জাকির হোসেনসহ নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ শাখার কয়েকজন কর্মকর্তা জড়িত।

১২০০ কোটি টাকার সার আত্মসাতের সুযোগ

অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের একটি পরিবহন টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে সর্বোচ্চ দরদাতাকে কাজ দেওয়া হয়েছে। এতে প্রায় ৭০ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। যাদের পরিবহন ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তারা প্রভাবশালী হওয়ায় সরকারি ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার সার আত্মসাৎ করেছে। এর মধ্যে নবাব অ্যান্ড কোম্পানি সাতটি চুক্তির আওতায় ৬৬ হাজার ৮৭৪ টন ইউরিয়া সার লোপাট করেছে। যার মূল্য প্রায় ৬১৯ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। আর পোটন ট্রেডার্সের সাতটি চুক্তির বিপরীতে ৭১ হাজার ৮০১ টনের বেশি সার লোপাট করেছে। যার মূল্য প্রায় ৫৮১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।

ডিপিএম কেনাকাটায় পছন্দের ঠিকাদার

বিসিআইসির বিভিন্ন কারখানায় ডিপিএম পদ্ধতিতে কেনাকাটায় অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা বিভিন্ন কারখানার ডিপিএম কেনাকাটায় প্রভাব বিস্তার এবং তদবিবের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন।

২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের প্রতিটি কারখানার ডিপিএম ক্রয় প্রক্রিয়ায় একই প্রতিষ্ঠান কতবার কাজ পেয়েছে, একই কর্মকর্তা কতগুলো ক্রয় কমিটিতে ছিলেন, বাজারমূল্যের তুলনায় পণ্যের দাম কত বেশি ছিল এবং কেন প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান না করে ডিপিএম করা হয়েছে এসব তথ্য যাচাই করছে দুদক। অভিযোগে সিন্ডিকেটের কয়েকজন কর্মকর্তার নামে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ফ্ল্যাট, জমি ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান থাকার তথ্য দেওয়া হয়েছে।

সম্পাদকীয় :

উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য : ডাঃ মোঃ হাফিজুর রহমান
সম্পাদক : তোফাজল আহমেদ ফারুকী
ব্যাবস্থাপনা সম্পাধক : আব্দুল্লাহ রানা সোহেল
প্রকাশক : মোঃ সোহেল রানা
বার্তা সম্পাদক : মোঃ আব্দুল কাদের জিলানী
প্রধান প্রতিবেদক : হাসিবুর রহমান হাসিব 

যোগাযোগের ঠিকানা :

লাবিনা এপার্টমেন্টে # বাড়ি এ-৩, রোড # ০৮, সেক্টর #০৩,উত্তরা
উত্তরা মডেল টাউন -ঢাকা -১২৩০, বাংলাদেশ

মোবাইল :  ০১৭১৭-৬৭৬৬৬৪

ই-মেইল :  dailyvoicenews247@gmail.com