প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রীদের বাসভবনের দায়িত্বে আ.লীগ ও যুবলীগপন্থী কর্মকর্তারা

আপলোড সময় : ২৮-১০-২০২৬ ০৫:১০:৫৬ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৮-১০-২০২৬ ০৫:১০:৫৬ অপরাহ্ন


প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তাদের বাসভবনসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়নে লটারি পদ্ধতি অনুসরণের নামে কারসাজি, গ্রেডিং শিটে পরিবর্তন এবং পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে বসানোর অভিযোগ উঠেছে। এ প্রক্রিয়ায় প্রায় ১২০ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, সততা ও বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) বিবেচনার পরিবর্তে প্রভাব ও পছন্দের ভিত্তিতে পাঁচটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে পদায়ন করা হয়েছে। আসন্ন ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিকল্পনা ও অর্থায়নের সঙ্গে এসব পদায়নের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবিও উঠেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, নির্বাহী প্রকৌশলীদের এ-প্লাস, এ, বি, সি ও ডি- এই পাঁচ শ্রেণিতে ভাগ করা হলেও ক্যাটাগরি নির্ধারণের লিখিত নীতিমালা, মূল্যায়নের বিস্তারিত এবং অনুমোদনসংক্রান্ত নথি প্রকাশ করা হয়নি। একাধিক বাক্সে কর্মকর্তাদের নাম আলাদাভাবে রেখে লটারির ফল প্রভাবিত করার অভিযোগও রয়েছে। ঢাকার চার থেকে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগে কারা দায়িত্ব পাবেন, তা আগেই নির্ধারণ করা হয়েছিল বলেও দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।

এ ঘটনায় নির্বাহী প্রকৌশলী আ ন ম মাজহারুল ইসলাম, মো. জিয়াউর রহমান, আহসান হাবীব, রেজা তাইমুর মালিক, মাসুম বিল্লাহ ও রাশেদ আহসানসহ কয়েকজনের গ্রেডিং ও পদায়নপ্রক্রিয়া তদন্তের দাবি উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, লটারির আগে গ্রেডিং শিটে পরিবর্তন এনে আ ন ম মাজহারুল ইসলাম ও মো. জিয়াউর রহমানের মতো কর্মকর্তাদের ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পদায়নের ব্যবস্থা করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত সচিব সারোয়ার আলম, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান, নির্বাহী প্রকৌশলী বিপ্লব, সংস্থাপন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাজহার এবং নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়ার ভূমিকা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

অভিযোগে বলা হয়েছে, আ ন ম মাজহারুল ইসলাম ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩, রেলওয়ে ডিভিশন ও প্রকল্প বিভাগ-৫-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পেয়েছেন। সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা পদায়নে প্রভাব ফেলেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। ২০০০-২০০৫ শিক্ষাবর্ষে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

মো. জিয়াউর রহমান সংস্থাপন-২ শাখায় দায়িত্ব পালনের পর শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১-এ পদায়ন পান। সংসদ ভবন ও সংসদ সদস্যদের আবাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দায়িত্বে তাঁর পদায়নের যোগ্যতা, অনুমোদন এবং প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।

অন্যদিকে, সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুর আত্মীয় এবং বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হিসেবে পরিচিত প্রকৌশলী মাসুম বিল্লাহকে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২-এ সংযুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় তাঁর চাকরি পাওয়া এবং প্রথম কর্মস্থলে পদায়নের বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।

অভিযোগে বলা হয়েছে, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় দেড় হাজার প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল), ২৫৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলী (ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল), ২০০ জন সহকারী প্রকৌশলী, ২১৯ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এবং ১২০ জন নির্বাহী প্রকৌশলী রয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

এই বদলির আওতায় সংসদ ভবন, সংসদ সদস্যদের আবাসন, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনসংশ্লিষ্ট স্থাপনা, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সদর দপ্তর এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে সাবেক রাজনৈতিক দলের এক নেত্রীর সম্ভাব্য আগমন, রাজনৈতিক অর্থায়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পদায়নের মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন।

অভিযোগকারীরা মনে করেন, ক্যাটাগরি নির্ধারণের নীতিমালা, গ্রেডিং শিট, লটারিতে ব্যবহৃত বাক্স ও নামের তালিকা, মূল্যায়ন কমিটির কার্যবিবরণী এবং চূড়ান্ত পদায়ন আদেশ পরীক্ষা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি যাচাইয়েরও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

গণপূর্ত কর্মকর্তা মাসুদ রানার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং বদলি-বাণিজ্যের মাধ্যমে পছন্দের কর্মকর্তাদের পদায়নে ভূমিকা রাখার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, রাজধানীর গুলশানসহ বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট, বাড়ি, প্লট, দোকান, জমি, স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ অর্থসহ শত কোটি টাকার কাছাকাছি অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন তিনি।

ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ ও বিভাগ-৪-এ দায়িত্ব পালনের সময় উন্নয়ন প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়ের ভুয়া প্রাক্কলন তৈরি, দরপত্রের গোপন তথ্য ফাঁস এবং কমিশনের বিনিময়ে ঠিকাদার নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে দুদকে দাখিল করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

রাজিবুল ইসলাম ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১ থেকে মহাখালীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের পর আবার একই বিভাগে পদায়ন পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর পদায়নের ধারাবাহিকতা এবং বদলির ক্ষেত্রে নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।

রেজা তাইমুর মালিক ঢাকা মেইনটেন্যান্স বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য লটারিতে নির্বাচিত হয়েছেন। ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালনের পর এনএসআই ও দুদকের সদর দপ্তর এবং প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনসংশ্লিষ্ট স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা যাচাই ও প্রশাসনিক বিধি অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা জানতে চেয়েছেন অভিযোগকারীরা। তাঁর বাবা মো. রেজাউল হক মালিক (মুকুল) চুয়াডাঙ্গা জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি ছিলেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া সাবেক মন্ত্রী শরিফ আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত রাশেদ আহসানের পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ময়মনসিংহে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর মিরপুর এবং বর্তমানে আজিমপুর-সংশ্লিষ্ট কর্মস্থলে তাঁর পদায়নে কোনো প্রভাব কাজ করেছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

পূর্তভবন-সংশ্লিষ্ট একটি পদে শামসুন্নাহার ঝুমার নাম লটারিতে উঠলেও একই পর্যায়ের অন্য কর্মকর্তাদের নাম কেন বাদ পড়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। লিবনী জামানকে হবিগঞ্জে পদায়ন করা হলেও একই পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তার নাম লটারিতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি বলে তাঁদের দাবি।

একই পদমর্যাদার অর্ধশত কর্মকর্তা বহাল থাকা সত্ত্বেও কারা লটারির আওতায় এসেছেন এবং কারা বাদ পড়েছেন, তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

লটারি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন), তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) এবং নির্বাহী প্রকৌশলীদের একটি অংশের বিরুদ্ধে কথিত সিন্ডিকেট গড়ে প্রায় ১২০ কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জনের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, সম্পদ বিবরণী, সম্পদ কেনার অর্থের উৎস এবং তাঁদের নিকটাত্মীয়দের নামে অর্জিত সম্পদের বিষয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ শাখাগুলোতে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত কর্মকর্তাদের পদায়ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির বাসভবন, ডিজিএফআই প্রধানের বাসভবন এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের বাসভবনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত কর্মকর্তাদের হাতে থাকলে তা সরকারের জন্য মঙ্গলজনক হবে না। এ ধরনের পরিস্থিতি গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন। বিষয়টি নিয়ে সরকারকে এখনই গভীরভাবে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

রাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, তাঁর বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বাইরে অন্য কারও জীবনের হুমকি রয়েছে বলে তিনি মনে করেন না। তাঁর বক্তব্য, যাঁরা এসব পদায়ন দিয়েছেন, তাঁরা জেনেশুনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা বিষয়টি না জেনে পদায়ন করেছেন এমনটি মনে করার কারণ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

দিলারা চৌধুরীর মতে, এসব পদায়নের পেছনে পরিকল্পনা থাকতে পারে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রাজনৈতিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ঘটনাগুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সম্পাদকীয় :

উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য : ডাঃ মোঃ হাফিজুর রহমান
সম্পাদক : তোফাজল আহমেদ ফারুকী
ব্যাবস্থাপনা সম্পাধক : আব্দুল্লাহ রানা সোহেল
প্রকাশক : মোঃ সোহেল রানা
বার্তা সম্পাদক : মোঃ আব্দুল কাদের জিলানী
প্রধান প্রতিবেদক : হাসিবুর রহমান হাসিব 

যোগাযোগের ঠিকানা :

লাবিনা এপার্টমেন্টে # বাড়ি এ-৩, রোড # ০৮, সেক্টর #০৩,উত্তরা
উত্তরা মডেল টাউন -ঢাকা -১২৩০, বাংলাদেশ

মোবাইল :  ০১৭১৭-৬৭৬৬৬৪

ই-মেইল :  dailyvoicenews247@gmail.com