সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, দিনমজুরের মজুরি কম দেওয়া, রমনা পার্কের ফল বিক্রির অর্থের হিসাব না রাখা এবং পার্কে অবৈধ কার্যক্রম চালানোর অভিযোগের মধ্যেই চলছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের এই শাখার কার্যক্রম। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন আরবরিকালচার গণপূর্ত উপবিভাগ-২-এর উপবিভাগীয় কর্মকর্তা মো. মোয়াজ্জেম হোসেন। একাধিকবার কারণ দর্শানোর নোটিশ ও সতর্কবার্তা পেয়েও তার বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন গণপূর্তের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এবার তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব অধিদপ্তরের পরিবর্তে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মুহাম্মাদ সারওয়ার জাহান এ তথ্য জানিয়েছেন।
গণপূর্তের একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, প্রধান আরবরিকালচারিস্টের একটি পদকে কেন্দ্র করে মোয়াজ্জেম হোসেন ও শেখ মোহাম্মদ কুদরত-ই-খুদার বিরোধ চরমে পৌঁছেছে। দুজনের দ্বন্দ্ব আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। শেখ মোহাম্মদ কুদরত-ই-খুদাকে পদ থেকে সরিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের রিজার্ভে রাখা হয়েছে। পরে নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদকে প্রধান বৃক্ষপালনবিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
নথি সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল-১-এর মামলায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব, সরকারি কর্ম কমিশনের সচিব এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান আরবরিকালচারিস্টকে নোটিশ দেওয়া হয়। মামলার আবেদনকারী ছিলেন মোয়াজ্জেম হোসেন। পরে ২০২৪ সালের ১৬ মে দেওয়া একটি আদেশের বিরুদ্ধে শেখ মোহাম্মদ কুদরত-ই-খুদা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল (১২৫/২০২৫) করেন। আদেশের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে করা আবেদনের শুনানির জন্য বিচারপতি মো. রেজাউল হক ২০২৫ সালের ১৯ মে দিন নির্ধারণ করেন।
দাপ্তরিক নথি অনুযায়ী, আরবরিকালচার বিভাগে বছরে ৮ থেকে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকে। আরবরিকালচার গণপূর্ত উপবিভাগ-২-এ দায়িত্ব পালনের সময় ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে তিন মাসে ৬ হাজার ৯৫৯ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে। ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-১-এর তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবদুল কাদের চৌধুরীর স্বাক্ষরিত চিঠিতে অর্থ চালানের মাধ্যমে জমা দিতে বলা হলেও নির্ধারিত সময়ে তা জমা দেননি মোয়াজ্জেম। সন্তোষজনক ব্যাখ্যাও দিতে পারেননি। ফলে বিভাগীয় মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আবদুল কাদের চৌধুরীর তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার কথা উল্লেখ করে মোয়াজ্জেমকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বঙ্গভবন, গণভবন, জাতীয় সংসদ ভবন ও বাংলাদেশ সচিবালয়ের মতো স্পর্শকাতর স্থাপনায় পদায়ন না করার সুপারিশ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর সুপারিশপত্র এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বিশ্বনাথ সরকার বিটু ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিমের লিখিত সুপারিশ কাজে লাগিয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান।
মোয়াজ্জেম ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্মৃতিসৌধ, বঙ্গভবন ও রমনা পার্কের সবুজায়নে কাজ শুরু করেন। পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০০৯ সালে চট্টগ্রামে এবং ২০১১ সালে রাজশাহীতে বদলি হন। ২০১২ সালে ঢাকার গণপূর্ত ভবনে ফিরলে তাকে রিজার্ভে রাখা হয়। বর্তমানে তিনি রমনা উপবিভাগ-২-এ দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে রাজধানীর দক্ষিণখানের আশকোনা পানির পাম্পের কাছে পাঁচ কাঠার প্লট কিনেছেন তিনি।
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে গালাগাল ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার চেষ্টা করেন মোয়াজ্জেম—এমন অভিযোগ তুলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চেয়ে চিঠি দেন প্রধান বৃক্ষপালনবিদ আবুল কালাম আজাদ। এ ছাড়া নির্ধারিত হারের চেয়ে কম মজুরি দেওয়ার অভিযোগ করেন প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন-সংলগ্ন আরবরিকালচারের কাজে নিয়োজিত দিনমজুর মনির। ১৮০ জন দৈনিকভিত্তিক শ্রমিককে সমান হারে মজুরি দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও তা অমান্য করার অভিযোগে মোয়াজ্জেমকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
রমনা পার্কে প্রায় ২৪৫টি নারিকেল ও ১৪৫টির মতো কাঁঠাল গাছ রয়েছে। অভিযোগ, নিলামে বিক্রির বিধান থাকলেও এসব ফলের অর্থ অনেক সময় যোগসাজশে ভাগবাটোয়ারা করা হয়। ফলে সরকারি হিসাবে অর্থ জমা পড়ে না। পার্কে ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের চাপ, জোর করে ছবি তুলে টাকা দাবি, ছবি না তুললে অশালীন মন্তব্য এবং দর্শনার্থীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন করার অভিযোগও রয়েছে। নিরাপত্তাকর্মী ও তদারককারীদের টাকা দিয়ে এসব অবৈধ কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে সকাল ৯টা থেকে ৯টা ৪০ মিনিটের মধ্যে অফিসে উপস্থিত থাকার নির্দেশনা অমান্য, নিয়মবহির্ভূত চিঠি পাঠানো এবং অসদাচরণের অভিযোগেও একাধিকবার কৈফিয়ত তলব ও চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। ঢাকার প্রথম অর্থঋণ আদালতে অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেডের শেরাটন হোটেল শাখার করা অর্থঋণ মামলা নম্বর ১০/২০১০-এর সমন অনুযায়ী, ব্যাংকের ২ লাখ ৬ হাজার ৫৩১ টাকা অনাদায়ি থাকায় তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
সারওয়ার জাহান বলেন, মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে একাধিকবার অনিয়ম ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ উঠেছে। এবারের অভিযোগ তদন্তের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে রমনা পার্কে উপবিভাগীয় কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে মোয়াজ্জেমকে পাওয়া যায়নি। পার্কের সুপারভাইজার ফজলুল হক বলেন, ঢাকা ক্লাবের পাশে কার্যালয়টি ভেঙে দেওয়ায় কর্মকর্তার বসার ব্যবস্থা নেই। এ কারণে মোয়াজ্জেম বেশিরভাগ সময় গণপূর্ত অধিদপ্তরে থাকেন। তার মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন ও খুদে বার্তা পাঠিয়েও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।