রপ্তানিমুখী দুটি পোশাক কারখানার বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা কাপড় অবৈধভাবে খোলাবাজারে বিক্রি, কম মূল্যে রপ্তানি দেখানো এবং মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ফাঁকির প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)। প্রতিষ্ঠান দুটি হলো রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেড ও লিশা টেক্স (প্রা.) লিমিটেড। পৃথক অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠান দুটির মোট ১০২ কোটি ৫৭ লাখ ১৩ হাজার ১২৮ টাকার রাজস্ব ফাঁকি উদঘাটন করেছে সংস্থাটি।
সোমবার (২ নভেম্বর) সিআইসির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেডের বিরুদ্ধে ৯৪ কোটি ৭৩ লাখ ৮৭ হাজার ৭২০ টাকা এবং লিশা টেক্সের বিরুদ্ধে ৭ কোটি ৮৩ লাখ ২৫ হাজার ৪০৮ টাকার রাজস্ব ফাঁকি উদঘাটন করা হয়েছে।
সিআইসির অনুসন্ধানে দেখা যায়, রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেড ৪১টি ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশনের (ইউডি) আওতায় বন্ড সুবিধায় মোট ২ হাজার ৮৬২ মেট্রিক টন ওভেন পলিয়েস্টার কাপড় আমদানি করে। কিন্তু আমদানি করা কাপড়ের প্রায় ৭৮ শতাংশ বা ২ হাজার ২৩৭ মেট্রিক টনের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। এসব কাপড় কারখানার গুদামে নেই, এমনকি রপ্তানির হিসাবেও পাওয়া যায়নি। সিআইসির ধারণা, বন্ডেড ওয়্যারহাউস থেকে কাপড়গুলো অবৈধভাবে সরিয়ে খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, যে ৩১টি ইউডির বিপরীতে কোনো রপ্তানি হয়নি, সেগুলোর মধ্যে ৩০টিতে আমদানি করা কাপড়ের পুরোটাই অবৈধভাবে অপসারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, আংশিক রপ্তানির ১০টি এন্ট্রিতেও আমদানি করা কাপড়ের প্রায় ৫৩ শতাংশের হিসাব মেলেনি।
কারখানার পুরো প্রাঙ্গণ পরিদর্শন করে সিআইসি ৬৯ হাজার ৩৮২ কেজি সুতা, ৮ লাখ ৪৫ হাজার ৩৯৭ পিস তৈরি পোশাক এবং মাত্র ২৫ হাজার ৫৩৩ দশমিক ৫০ কেজি ওভেন পলিয়েস্টার কাপড়ের মজুদ পেয়েছে। অথচ আমদানি করা কাপড়ের তুলনায় অবশিষ্ট মজুদের পরিমাণ মাত্র শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধির লিখিত বক্তব্যের সঙ্গেও আমদানি তথ্যের অসংগতি পাওয়া গেছে। প্রতিনিধি জানান, গত এক মাসে এ ধরনের কাপড় দিয়ে কোনো পোশাক উৎপাদন বা রপ্তানি হয়নি। অথচ বিল অব এন্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই সংশ্লিষ্ট ইউডিগুলোর বিপরীতে প্রায় ৩৯০ মেট্রিক টন কাপড় আমদানি করা হয়েছে। সিআইসির অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, ৪১টি ইউডির আওতায় আমদানি করা মোট কাপড়ের প্রায় ৮২ শতাংশ ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবরের শুরুর মধ্যে আমদানি করা হয়েছে।
অবৈধভাবে অপসারিত কাপড়ের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ১৩৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এর বিপরীতে রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেডের ৯৪ কোটি ৭৩ লাখ ৮৭ হাজার ৭২০ টাকার শুল্ক-কর ফাঁকি উদঘাটন করা হয়েছে।
অন্যদিকে, লিশা টেক্স (প্রা.) লিমিটেডের বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার কেজি পলিয়েস্টার কাপড়ের হদিস না পাওয়ার তথ্য পেয়েছে সিআইসি। এসব কাপড় বন্ডেড ওয়্যারহাউস থেকে অবৈধভাবে সরিয়ে খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। শুধু এ খাতেই প্রায় ৬ কোটি ৯০ লাখ টাকার শুল্ক-কর ফাঁকি হয়েছে।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অনুমোদনের চেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানি করলেও চুক্তিমূল্যের চেয়ে কম রপ্তানিমূল্য দেখানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইউডির বাইরে স্থানীয় ঋণপত্রের মাধ্যমে কাঁচামাল সংগ্রহ এবং বাধ্যতামূলক ২০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত পূরণ না করার তথ্যও পেয়েছে সিআইসি।
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, চার লাখের বেশি পিস পোশাকের আনুষঙ্গিক কাঁচামাল অনুমোদন ছাড়াই স্থানীয় বাজার থেকে কেনা হয়েছে এবং এসব ক্রয়ের বিপরীতে মূসক দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি লাইসেন্সবিহীন একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৩ কোটি ২৩ লাখ টাকার কিট ব্যাগ সরবরাহ করে মূসক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। এসব অনিয়মের মাধ্যমে লিশা টেক্সের মোট ৭ কোটি ৮৩ লাখ ২৫ হাজার ৪০৮ টাকার রাজস্ব ফাঁকি উদঘাটন করা হয়েছে।
সিআইসি জানায়, দুটি প্রতিষ্ঠানের কারখানায় সরেজমিন পরিদর্শন করে কাঁচামালের মজুদ যাচাই করা হয়েছে। পাশাপাশি আমদানি ও রপ্তানির তথ্যের সঙ্গে কারখানার মজুদের হিসাব মিলিয়ে দেখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর তথ্যও পর্যালোচনা করা হয়েছে।
বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, শুল্কমুক্ত কাঁচামাল অবৈধভাবে খোলাবাজারে বিক্রি এবং রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধে এ ধরনের অভিযান ও অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল।